munda-revolt
Madhyamik

মুন্ডা বিদ্রোহ

ইতিহাসদশম শ্রেণি – প্রতিরোধ বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ (পর্ব – ৪)


গত পর্বে আমরা সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আমরা মুন্ডা বিদ্রোহ সম্পর্কে জানব।

সাঁওতাল বিদ্রোহ ও মুন্ডা বিদ্রোহের মধ্যে অনেকগুলি ক্ষেত্রে মিল ছিল। সাঁওতাল হুলের যেমন বিদ্রোহাতীত একটি ব্যঞ্জনা রয়েছে তেমনই মুন্ডাদের ক্ষেত্রে ছিল ‘উলগুলান’ বা বিরাট তোলপাড়। ঔপনিবেশিক ভূমি-রাজস্ব নীতি ও উপজাতীয় প্রথার (customery rights) সংঘাত, ধর্মান্তরকরণ, মিশনারী অপপ্রচার, স্বায়ত্তশাসনের দাবি প্রভৃতি দুটি বিদ্রোহেরই সাধারণ দিক।

তবে সাঁওতাল বিদ্রোহ সংঘটিত হয় উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আর ‘উলগুলান’ হয়েছিল উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে ১৮৯৯-১৯০০ সাল নাগাদ।

ততদিনে ‘ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন’ (১৯৬৫) বলবৎ হয়ে গিয়েছে এবং আদিবাসী সমাজে সেই আইনের প্রভাবও অনুভূত হতে শুরু করেছে। অন্যদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরোক্ষ শাসনের জায়গায় এসেছে ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ শাসন। ফলে বিদ্রোহের ভাষায় যে পার্থক্য থাকবে তার বলাই বাহুল্য।

মুন্ডা বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট

ভারতের আদিমতম অধিবাসীদের মধ্যে মুন্ডারা অন্যতম।তারা ছোটনাগপুর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অরণ্যে বসবাস করত।

১) ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন তাদের জীবন-জীবিকার সামনে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দেয়। পতিত জমি আবাদ করা ও রেলপথ সম্প্রসারণ – ঔপনিবেশিক সরকারের এই দ্বৈত নীতির ফলে এই অরণ্য অঞ্চলে কালক্রমে বহিরাগত মহাজন ও ঠিকাদারদের আবির্ভাব হয়। এরা মুন্ডাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের ঋণের জালে আবদ্ধ করে ও তাদের কিনে নেওয়া জমিতে বেগার খাটাতে শুরু করে।

২) নতুন ভূমি-ব্যবস্থা চালু হলে মুন্ডাদের চিরাচরিত যৌথ মালিকানাভিত্তিক খুৎকাঠি প্রথা সঙ্কটের মুখে পড়ে।

৩) ইউরোপীয় চা-মালিকদের ঠিকাদারেরা মূর্খ মুন্ডাদের ভুলিয়ে ভালিয়ে অসমের চা বাগানে পাচার করে দিত। সেখানে তারা কার্যত ইউরোপীয় মালিকদের ক্রীতদাসে পর্যবসিত হয়।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলি – বাংলা | English | ইতিহাস | ভূগোল

৪) মুন্ডাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হত। মিশনারীরা মুন্ডাদের সনাতনী ধর্ম ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকে।

৫) বহিরাগতরা মুন্ডাদের প্রলোভিত করে অথবা মদের নেশায় নেশাগ্রস্ত করে জমি, জায়গা সব লিখিয়ে নিত। এরফলে মুন্ডাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে।

৬) সর্বোপরি, ঔপনিবেশিক অরণ্য আইনের কারিকুরি অরণ্যনির্ভর মুন্ডাদের জীবিকা নির্বাহের পথে নানান বাধার সঞ্চার করে।

এইসব কারণে ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে মুন্ডারা ঐক্যবদ্ধভাবে মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে প্রতিবাদপত্র পাঠায়। অর্থাৎ, প্রথমদিকে ব্রিটিশ রাজের সদিচ্ছার ওপর এদের আস্থা ছিল। কিন্তু এই আবেদনপত্রে সরকার কর্ণপাত করেনা।

বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ শেষ ডিসেম্বর স্বাধীন মুন্ডারাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুন্ডারা বিদ্রোহ ঘোষনা করে।

মুন্ডাদের কাছে বিরসা ‘ধরতি আবা’ বা ‘পৃথিবীর পিতা’ নামে পরিচিত ছিলেন। আদিবাসীরা ‘স্বাধীনতা’, ‘ক্ষমতায়ন’, ‘পৃথিবী’ প্রভৃতি শব্দের ব্যাখ্যা তুলে আনত নিজেদের অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে। এগুলো থেকে তাদের বিশ্ববীক্ষা বা world view এর একটি ধারণা পাওয়া যায়।

মুন্ডা বিদ্রোহের বিস্তার ও পরিণতি

শীঘ্রই বিদ্রোহের আগুন রাঁচি, কারা, বাসিয়া, তোরপা, তামার, চক্রধরপুর প্রভৃতি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। গয়া মুন্ডা বিদ্রোহীদের সেনাপতি নিযুক্ত হন। বিদ্রোহীদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল জমিদার, মহাজন, পুলিশ ও ইংরেজ কর্মচারী।

সরকার এই বিদ্রোহ দমনে তৎপর হয়ে ওঠে। সইল রাকার পাহাড়ের যুদ্ধে ১৯০০ সালের ৯ জানুয়ারী মুন্ডা বাহিনী পরাজিত হয়। যুদ্ধে বহু মানুষ প্রাণ হারান; বিরসা মুন্ডা-সহ অনেকে বন্দিও হন।

বিরসা মুন্ডাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

৯ জুন রাঁচির কারাগারে কলেরায় বিরসা মুন্ডার মৃত্যু হয়। এরপর আন্দোলনের ঢেউ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে।

মুন্ডা বিদ্রোহের ফলাফল

মুন্ডা বিদ্রোহ তার অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণে অনেকটাই সফল হয়েছিল। বিদ্রোহের অভিঘাতে সরকার খুৎকাঠি প্রথা মেনে নিতে ও বেগার শ্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া এই বিদ্রোহের প্রভাবেই ১৯০৮ সালে ‘ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ত্ব আইন’ পাস হয়। মুন্ডাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টি করতে এই বিদ্রোহ অনেকাংশে সফল হয়েছিল।

আদিবাসী সমাজের বিকল্প প্রতিবাদের ভাষা

চুয়াড় থেকে আরম্ভ করে সমস্ত আদিবাসী আন্দোলনেরই কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জল, জঙ্গল, জমির অধিকার রক্ষার লড়াই। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কিছু মানুষের কাছে অস্ত্রধারণ ভিন্ন কোনো উপায়ই অবশিষ্ট রাখেনি নির্দয় ঔপনিবেশিক সরকার। এই অস্ত্রধারণের মধ্যে ক্ষমতার দাম্ভিকতা ছিল না, ছিল ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন।


দশম শ্রেণির অন্য বিভাগগুলিগণিত | জীবন বিজ্ঞান | ভৌতবিজ্ঞান

ভালোভাবে খেয়াল করলে উনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন পর্বে সংঘটিত হওয়া আদিবাসী বিদ্রোহগুলির বহিরঙ্গে এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখতে পাবে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ পূর্ববর্তী আন্দোলন যেমন ধর্মীয় ভাবাবেগকেন্দ্রিক ছিল, পরবর্তীকালের মুন্ডা প্রভৃতি আন্দোলনে ঔপনিবেশিক অরণ্য আইনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতিবাদ দেখা যায়। তবে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রশমনের নীতি যে ঔপনিবেশিক আমলে আদিবাসী সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতি

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এম ফিল পাঠরত রাতুল বিশ্বাস। ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি লেখা-লিখিতেও সমান উৎসাহী রাতুল।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

X_hist_3d