barir-kache-arshinogor
Class-11

বাড়ির কাছে আরশিনগর

বাংলাএকাদশ শ্রেনি – বাড়ির কাছে আরশিনগর (প্রথম পর্ব)


লালন ফকির রচিত বাড়ির কাছে আরশিনগর কবিতা বা গানটি আমরা দুটি পর্বে আলোচনা করবো। প্রথম পর্বে আলোচিত হবে কবি পরিচিতি, উৎস এবং মূলবক্তব্য আর দ্বিতীয় পর্বে থাকবে কবিতার বিষয়সংক্ষেপ।

কবি পরিচিতি

প্রাচীন বাংলার এক শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক, দার্শনিক লালন ফকিরের জীবন অনেকটাই আলো-আঁধারির মতো। নানা জন নানা সময়ে তাঁর জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসটি লালনের জীবনকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

অনেকের মতে, লালন ১৭৭৪ সালে নদীয়ার গড়াই নদীর তীরে চাপড়া গ্রামে সংলগ্ন ভাঁড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবারের একমাত্র সন্তান লালন সাঁই। লালনের বাবার নাম মাধব কর আর মায়ের নাম জানা যায় পদ্মাবতী। অনেকে আবার এই মতের বিরোধিতা করে বলেছেন লালনের বাবার নাম অধরচন্দ্র কর। ছোটোবেলাতেই বাবা মারা গেলে লালন প্রথাগত শিক্ষাগ্রহণ করতে পারেননি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাঁর শিক্ষালাভের সুযোগ ঘটেনি।


একাদশ শ্রেণি থেকে→ Physics | Chemistry Biology | Computer

আবার এই মত খণ্ডন করে অনেক গবেষক জানিয়েছেন যে যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হরিশপুর গ্রামে লালনের জন্ম হয়েছিল। অনেকে বলেন লালন আসলে মুসলিম পরিবারের সন্তান ছিলেন। এছাড়াও কেউ কেউ মনে করে থাকেন লালন যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামের মুসলমান তন্তুবায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাবার অবর্তমানে সাংসারিক দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেন লালন আর সেসময় তাঁর বিবাহও সম্পন্ন হয়। মা আর স্ত্রীকে নিয়ে পারিবারিক বিবাদের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হয় লালনকে।

প্রতিবেশী বাউলদাসের সঙ্গে একদিন লালন গঙ্গাস্নানে যান আর তারপরই গুরুতরভাবে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন তিনি।

তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে সেসময় অচৈতন্য হওয়ার কারণে ভুলবশত মৃত ভেবে কলার ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেন। লালনের অচৈতন্য দেহ নদীতে ভাসতে ভাসতে পারে উঠলে এক মুসলমান রমণী তাঁকে উদ্ধার করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান, সেখানেই দীর্ঘদিন সেবা-যত্ন পেয়ে লালন সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস, সুস্থ হয়ে নিজের গ্রামে ফিরে গেলেও শুধুমাত্র মুসলমানের ঘরে থাকায় তাঁকে সমাজে ঠাঁই দেওয়া হয়নি।

ঠিক এইসময় সিরাজ সাঁই নামে এক তত্ত্বজ্ঞানী বাউল সাধকের কাছে লালন বাউলধর্মে দীক্ষা নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। ছেউড়িয়ায় আখড়া তৈরি করে লালন এরপর বাউল সাধনায় নিবিষ্ট হন, শুরু হয় তাঁর গান বাঁধা। দিকে দিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও লালনের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে জানা যায় ১৮৮৯ সালের ৫ মে শিলাইদহে বোটের উপর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন সাঁইকে সামনে বসিয়ে একটি ছবি এঁকেছিলেন। ছেউরিয়ার আখড়াতেই ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর আনুমানিক ১১৬ বছর বয়সে লালন ফকির মারা যান।

বাড়ির কাছে আরশিনগর-উৎস

১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘লালন গীতিকা’ সংকলন থেকে আলোচ্য ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ গানটি নেওয়া হয়েছে। সংকলনের সম্পাদক ছিলেন ড. মতিলাল দাশ এবং পীযূষকান্তি মহাপাত্র। এই গানটি যদিও ১৯৫৭ সালে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ বইতেও সংকলিত হয়েছিল। মূল গানে বানান ছিল – বাড়ীর কাছে আরশীনগর।


একাদশ শ্রেণি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

বাড়ির কাছে আরশিনগরের মূল বক্তব্য

মন্ত্র-ত্নত্র, সাধন-ভজন, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ত্যাগ করে নিজের অন্তরের সমুদ্রে ডুব দিয়ে রত্নধন খুঁজে বের করাই হল জীবনের লক্ষ্য। ঈশ্বর আছেন নিজের দেহের মধ্যেই, তিনি আমাদের ‘মনের মানুষ’। শুদ্ধ আত্মায় পার্থিব কামনা-বাসনা সব ত্যাগ করে সাধনা করলেই একমাত্র ঈশ্বরকে পাওয়া যায়। এই ঈশ্বরই ‘পড়শি’, তিনি নিরাকার ব্রহ্মস্বরূপ। চারপাশে অগাধ সমুদ্রের বাধা পেরিয়ে তবে যম-যাতনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আজীবন দুঃখ-শোক-রোগ-জরার হাত থেকে মুক্তি পেতে আত্মানুসন্ধানের পথই বেছে নেন বাউল সাধকেরা আর লালনও এই গানে সেই গুহ্য সাধনার রূপটি তুলে ধরেছেন।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → বাড়ির কাছে আরশিনগর সরলার্থ


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।