telenapota-abiskar
Class-11

তেলেনাপোতা আবিষ্কার – প্রেমেন্দ্র মিত্র

বাংলাএকাদশ শ্রেণি – তেলেনাপোতা আবিষ্কার (প্রথম পর্ব)


প্রেমেন্দ্র মিত্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী

রবীন্দ্রনাথের পরবর্তীকালে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অগ্রজ সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পটি।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের জন্ম হয় ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর পিতার নাম জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র ও মাতার নাম সুহাসিনী দেবী। মাত্র সাত-আট বছর বয়সেই মায়ের মৃত্যু হয় তাঁর আর সেই থেকে তিনি দাদামশাই রাধারমণ ঘোষের কাছে মির্জাপুরে বড়ো হতে থাকেন।

পরে দাদামশাই মারা গেলে তিনি চলে আসেন নলহাটিতে এক আত্মীয়ের কাছে।

সেখানে একটি মাইনর স্কুলে পড়াশোনা শুরু হলেও পরে কলকাতার সাউথ সাবআরবান স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন প্রেমেন্দ্র মিত্র। ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন তিনি ১৯২০ সালে।

তারপর কিছুদিন এই পড়া পড়ে আবার কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়তে যান তিনি শ্রীনিকেতনে। আবার কিছুদিন পর কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি।

বিশৃঙ্খল জীবনে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে তিনি জগন্নাথ কলেজে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু বাধ্যত জীবিকার সন্ধানে সেই পড়ায় ইতি জানিয়ে কলকাতায় চলে আসতে হয় তাঁকে।

স্কুলশিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু হলেও ব্যবসা, ওষুধ কোম্পানির সেলস্‌ম্যানের কাজ করে অবশেষে সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপনা শুরু করেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রথম তাঁর দুটি গল্প প্রকাশ পায় – ‘শুধু কেরানী’ ও ‘গোপনচারিণী’। এখান থেকেই তাঁর জীবন পাল্টাতে শুরু করে। সাহিত্যজীবনে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে একসময় এটাই তাঁর পেশা ও নেশা হয়ে ওঠে। রংমশাল, কালিকলম, নবশক্তি, পক্ষীরাজ-এর মতো সেকালের নামকরা পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি শুরু করেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, সেই সঙ্গে এই পত্রিকাগুলির সম্পাদনার ভারও ছিল তাঁর হাতে। যুগ্মভাবে তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘নিরুক্ত’ এবং ‘কবিতা’ পত্রিকা।

বার্নার্ড শ, সমারসেট মম প্রমুখের বহু গল্প, নাটক এমনকি হুইটম্যানের কবিতাও প্রথমদিকে তিনি অনুবাদ করেছেন। তাঁর নিজের সৃষ্ট উল্লেখযোগ্য চরিত্র ঘনাদা কিশোরদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়।

এছাড়া গোয়েন্দা গল্পেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার কারণ সেই ঘরানাতেও পরাশর বলে একটি গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করে তিনি বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের বিস্মিত করেছেন।

এককালে ‘কৃত্তিবাস ভদ্র’ ছদ্মনামে বহু লেখা লিখেছেন। গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি বহু চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন, প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রের কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছেন।

অনেকগুলি ছবিতে গানও লিখে দিয়েছেন তিনি। তাঁর নিজের পরিচালিত ছবিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘পথ বেঁধে দিল’, ‘নতুন খবর’, ‘কালোছায়া’, ‘কুয়াশা’ এবং হিন্দিতে ‘রাজলক্ষ্মী’।

প্রেমেন্দ্র মিত্র মোট ৫০টি উপন্যাস, ৩০টি ছোটোগল্প, ৪টি নাটক, ৬টি অনুবাদগ্রন্থ এবং বহু কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে ‘পাঁক’, ‘মিছিল’, ‘প্রতিধ্বনি ফেরে’, ‘আগামীকাল’, ‘বিসর্পিল’ ইত্যাদি স্মরণীয়।

‘বেনামী বন্দর’, ‘পুরুল ও প্রতিমা’, ‘মৃত্তিকা’, ‘অফুরন্ত’, ‘নিশীথ-নগরী’, ‘কুড়িয়ে ছড়িয়ে’, ‘সামনে চড়াই’, ‘সপ্তপদী’ ইত্যাদি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ছোটোগল্প সংকলন।

প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘সাগর থেকে ফেরা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য আকাদেমি পুরস্কার এবং রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন।

এছাড়াও তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখ্য ‘প্রথমা’, ‘সম্রাট’, ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘হরিণ চিতা চিল’, ‘অথবা কিন্নর’, ‘নদীর নিকটে’ ইত্যাদি।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ‘দেশিকোত্তম’ এবং ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৮ সালের ৩ মে তাঁর মৃত্যু হয়।

‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পের উৎস

আলোচ্য ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পটি প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা ‘কুড়িয়ে ছড়িয়ে’ নামক গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া তাঁর ‘জলপায়রা’, ‘নির্বাচিতা’ এবং ‘প্রেমেন্দ্র মিত্রের শ্রেষ্ঠ গল্প’ সংকলনেও এই গল্পটি রয়েছে।

‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পের সারসংক্ষেপ

তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পটি একটি অবাস্তবের গল্প, একটি স্বপ্নময় আপাত অসম্ভবের কাহিনি। পুরো লেখাটাই লেখক সম্ভাবনার ইঙ্গিত ছড়িয়ে লিখেছেন, কোথাও স্পষ্ট করে কিছুই যেন বলা হচ্ছে না।

গল্প শুরু হয় কোনো এক শনি বা মঙ্গলবারের মধ্যে সম্ভবত মঙ্গলবার তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে যাওয়ার প্রসঙ্গে। শনি বা মঙ্গলের মধ্যে মঙ্গলবারেই গল্পকথক খোঁজ পেয়েছিলেন তেলেনাপোতার।

নিত্যদিনের কাজকর্ম, নাগরিক ভিড়ে ক্লান্ত হয়ে উঠলে কাজ থেকে ছুটি নিয়ে দুদিনের জন্য এক বন্ধুর প্রলোভনে গল্পকথক ঘুরে আসেন তেলেনাপোতায়। সেই বন্ধুটি মৎস্য-শিকারপ্রিয় গল্পকথককে জানায় যে তেলেনাপোতার দিঘির জলের মাছেরা বড়শিতে বিদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। তাই উৎসাহিত হয়ে বেরিয়ে পড়েন গল্পকথক, সঙ্গে থাকেন তাঁরই দুই বন্ধু যাদের মধ্যে একজন পানরসিক এবং একজন নিদ্রাপ্রিয়।

প্রত্যেক বন্ধুরই তেলেনাপোতায় আসার পৃথক কারণ থাকবে। ভাদ্র মাসের কোনো এক বিকেলে জিনিসে-মানুষে ঠাসাঠাসি কোনো একটা বাসে চড়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে ঘন্টা দুয়েকের পরে তেলেনাপোতার কাছে একটি বাসস্টপে নেমে পড়তে হবে।

তারপর হঠাৎই গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যাবে চারপাশ, কেউ কারো মুখ দেখতে পাবে না আর। মশাদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে হবে। এমন বিরক্তকর পরিস্থিতিতে গল্পকথক চাইবেন কলকাতায় ফিরে যেতে আর তখনই দূর্ভেদ্য জঙ্গলের ভিতর থেকে এক অদ্ভুত আশ্চর্যজনক শব্দ শোনা যায়।

যেন মনে হয় নির্জন নিস্তব্ধ বনের মধ্যে এ যেন কারো এক অমানবিক কান্না থমকে থমকে শোনা যাচ্ছে। সেই শব্দে তিন বন্ধু সচকিত এবং সামান্য আশান্বিত হয়ে উঠবে। অস্পষ্ট আঁধারে একটা দোদুল্যমান আলোক শিখা দেখা যায় প্রথমে, তারপর ধীরে ধীরে প্রকটিত হয় একটা গোরুর গাড়ি। সেই গাড়িটি ক্রমে শ্লথ গতিতে সামনে আসে।


একাদশ শ্রেনি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

গল্পকথকের মনে হয় ভূগর্ভের কোনো বামনের দেশ থেকে তা উঠে এসেছে, এতটাই ক্ষুদ্র সেই গোরুর গাড়িতে কোনোরকমে চাপাচাপি করে তারা বসে পড়ে। তারপর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলতে থাকে সুড়ঙ্গ কেটে রাস্তা বের করার মতো। গাড়ির ঝাঁকুনিতে মাঝেমাঝেই পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি লেগে যাবে বন্ধুদের। ধীরে ধীরে কথকের মনে হবে চারপাশের গাঢ় অন্ধকারে তাঁর চেতনার শেষ স্তরটিও যেন ডুবে গেল।

চেনা পৃথিবীকে অনেক পিছনে ফেলে এসেছেন তারা। হঠাৎ বাজনার শব্দে চকিত দৃষ্টিতে তারা লক্ষ করবেন একটা ক্যানেস্তারা বাজিয়ে যাচ্ছে গোরুর গাড়ির চালকটি। এর কারণ জানতে চাইলে চালক বলবেন বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যেই এটি করা।

একটা ভয়ের শিহরণ খেলে যাবে তাঁদের শরীরে। চিতাবাঘ তাড়ানোর এমন নমুনা দেখে ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। কলকাতা থেকে মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে এমন জায়গায় চিতাবাঘের কল্পনা করাও দুঃসাধ্য।

আকাশে কৃষ্ণপক্ষের বিলম্বিত ক্ষয়িত চাঁদ দেখা যাবে। পুরনো ভাঙা মন্দির, প্রাসাদের অবশিষ্টাংশ, দেউড়ির খিলান ইত্যাদি সব গোরুর গাড়ির পাশ দিয়ে সরে সরে যাবে। গল্পকথক সারাদেহে রোমাঞ্চ অনুভব করবেন।

পুরাকালের যেন কোনো প্রাচীন স্মৃতির কাছাকাছি এসে পড়েছেন তারা। একটা ভগ্নপ্রায় অট্টালিকার সামনে এসে গোরুর গাড়িটি দাঁড়ায় যে অট্টালিকার একটি কোনোরকম বাসযোগ্য ঘরে তাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

গাড়োয়ান ঘরে দিয়ে যায় লণ্ঠন আর তিনটে জল-ভরা কলশি। বোঝাই যাবে সেই ঘরে বহুদিন কেউ থাকেনি। সারা ঘর জুড়ে অদ্ভুত এক ভ্যাপসা গন্ধ। মনে হবে যেন বেশি হাঁটাহাঁটি করলেই ঘরের ছাদ থেকে ভাঙা প্লাস্টার খসে পড়বে তাদের উপর। গল্পকথক ভাবেন ঘরের রুষ্ট আত্মার অভিশাপে পলেস্তরা খসে পড়তে পারে। চামচিকেদের সঙ্গে সারারাত বিবাদ চলে তাদের। পানরসিক বন্ধুটি ততক্ষণে মদ্যপানে নিমগ্ন আর অন্য বন্ধুটি অভ্যেসমতো নিদ্রামগ্ন।


আরো পড়ুন কর্তার ভূত গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

কিন্তু ঘুম নেই গল্পকথকের!

এমনটাই দরকার যেন, তিন বন্ধুর দুই বন্ধু এমনই হওয়া উচিত যেন। রাত বাড়ে, লণ্ঠন একসময় নিভে যায়। মশারা আক্রমন শুরু করে। মশাদের বসার ভঙ্গিমা দেখে বোঝা যায় সেগুলি ম্যালেরিয়া-বাহক অ্যানোফিলিস।

কোনো এক দূর্নিবার আকর্ষণে তিনি টর্চ নিয়ে ছাদে উঠে পড়বেন। ছাদের আলিসা অনেক স্থানেই ভাঙা, ফাটলগুলিতে বড়ো বড়ো গাছ গজিয়েছে। সেই গাছের শিকড়গুলি ভেতরের জীর্ণ প্রাসাদটিকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছে।

কৃষ্ণপক্ষের ম্লান আলোয় সব মোহময় মনে হবে কথকের।

তাঁর মনে হবে কোনো এক রূপকথার প্রাসাদে ঘুমন্ত রাজকন্যার মতো সোনার কাঠি রূপার কাঠি পাশে নিয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে সেই বাড়িটি। হঠাৎ বাড়ির এক পাশে একটা খোলা জানালা দিয়ে অল্প আলো দেখা যাবে আর সেই ম্লান আলোয় জানালার পাশে এক ছায়ামূর্তি দেখতে পাবেন কথক কিন্তু সে যে কে আসলে তা বুঝতে পারবেন না তিনি।

এই পুরো ঘটনাটাই যেন একটা স্বপ্ন বলে মনে হবে তাঁর।

অবশেষে ছাদ থেকে নেমে এসে দুই বন্ধুর মাঝে তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন।

সকালে বড়শি আর মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে পুকুরে ছিপ ফেলে অনেকক্ষণ যাবৎ মাছ ধরার জন্য অপেক্ষা করেও একটা মাছও ধরতে পারবেন না কথক। ফাতনা নড়তে দেখে চমক ভাঙলে তিনি বুঝতে পারবেন একটি মেয়ে কলসিতে জল ভরছে। সেই মেয়েটি ফাতনার দিকে তাকিয়ে কলসি কাঁখে নিয়ে ফিরে যাবার সময় বড়শিতে টান দিতে বলবেন কথককে।


আরো পড়ুন বাড়ির কাছে আরশিনগর কবিতার মূল বক্তব্য

মনে হবে না যেন সে কোনো এক অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে কথা বলছে। অগত্যা মাছ ধরায় ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরে কথক দেখবেন তাঁর ব্যর্থতার গল্প দুই বন্ধু জানতে পেরেছেন ইতিমধ্যে আর তাঁদের থেকেই কথক জানবেন সেই মেয়েটি আসলে পানরসিক বন্ধু মণির জ্ঞাতিস্থানীয়া যামিনী।

কথক বুঝতে পারেন আগের রাতে সেই ছায়ামূর্তিটি আসলে যামিনীরই।

যামিনীর বাড়িতেই তাঁদের সে বেলা খাওয়া-দাওয়া সারা হয়। মনুষ্য-বর্জিত এই নির্জন লোকালয়ে কাটানো সমস্ত জীবনের বেদনা যেন যামিনীর মুখে ফুটে উঠতে দেখবেন কথক। মাঝেমাঝে শোনা যাবে উপরের ঘর থেকে ক্ষীণকণ্ঠে কেউ যামিনিকে ডাকছে আর ব্যস্ত হয়ে যামিনী বারবারই বাইরে চলে যাবে। আসলে তিনি যামিনীর অশক্ত বৃদ্ধা মা।

পরে খাওয়া শেষ হলে বাধ্য হয়ে মণিদাকে আলাদা করে ডেকে যামিনী জানাবে যে তাঁর মা কিছুতেই এবার শুনছেন না। তিনি একটিবার নিরঞ্জনের সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি বিশ্বাস করে বসে আছেন যে নিরঞ্জন এসেছে এবং সে লজ্জিত বলে যামিনির মায়ের সামনে আসতে পারছে না।


একাদশ শ্রেনি থেকে → Physics | Chemistry | Biology | Computer

যামিনী জানায় অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর এই অধৈর্য প্রলাপ আরো বেড়েছে। এই কথা শুনে মণিদা বেশ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি জানান যে যদি যামিনীর মা সত্যই চোখে দেখতে পেতেন তাহলে হয়তো তিনি দেখিয়ে দিতে পারতেন যে নিরঞ্জন সত্যই আসেনি।

মায়ের ডাকে যামিনি এবার উপরে চলে যাবে। মণিদা ঘরে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করবেন। তারপরে কথক যেতে চাইবেন মণিদার সঙ্গে আর সেই বৃদ্ধা মায়ের সামনে উপনীত হওয়া মাত্র কথককে নিরঞ্জন ভেবে বসবেন যামিনীর মা।

মণিদা জানিয়েছিল, দূরসম্পর্কের বোনপো এই নিরঞ্জনের সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলেন বৃদ্ধা, কিন্তু নিরঞ্জন বিদেশ যাবার অছিলায় আর এই বাড়িতে আসেনি এবং সে নিজে বিবাহ করে সুখে সংসার করছে।
এই অপ্রিয় সত্য জানতে পারলেই বৃদ্ধার মৃত্যু হতে পারে ভেবে কেউ একথা এখনও পর্যন্ত তাঁকে বলতে পারেনি।


আরো পড়ুন নীলধ্বজের প্রতি জনা – কবিতার বিষয়বস্তু

জানলা বন্ধ সেই প্রায়ান্ধকার ঘরে ঢুকে কথক দেখবেন একটা ভাঙা চৌকিতে ছেঁড়া কাঁথা জড়ানো কঙ্কালসর্বস্ব শরীরে যামিনীর বৃদ্ধা মা শায়িত। পায়ের শব্দ শুনেই কথককে নিরঞ্জন ভেবে বৃদ্ধা বলেন আবার আগেরবারের মতো সে পালিয়ে যাবে কিনা!

একমাত্র তাঁর আশাতেই এই যমপুরীতে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। যামিনীকে নিয়ে নিরঞ্জন সুখী হবেন একথাও জানান তিনি।

যামিনী অত্যন্ত সহনশীল একটি মেয়ে। এভাবে অনেকক্ষণ কথা বলার পরে যামিনী বিব্রত হয়ে পড়েন, অগোচরে চোখের জল মোছেন আর এদিকে যামিনীকে নিরঞ্জন গ্রহণ করবে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে এক মোহাবেশের মধ্যে পড়ে কথক সম্মতি জানায়।

কথক নিরঞ্জনের হয়ে বৃদ্ধাকে কথা দেন যামিনীকে তিনি বিয়ে করবেন। সেদিন বিকেলেই আবার তাঁদের ফিরে যেতে হবে। গাড়ি ছাড়ার সময় যামিনি কথককে মনে করিয়ে দেবেন ছিপ নিয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু কথক তা রেখে দিতে চেয়ে বলবেন যে একবার তেলেনাপোতার মাছ ছাড়া পেয়েছে বলে দ্বিতীয়বার নাও পেতে পারে।

যামিনীর মুখে কৃতজ্ঞতার এক হাসি দেখে রওনা দেন কথক আর তাঁর মনের মধ্যে যেন ফিরে আসার গান বাজতে থাকে। শেষে কলকাতার নাগরিক রাজপথে নেমে আস্তে আস্তে তেলেনাপোতার সব ঘটনা আবছা স্মৃতির মতো মিলিয়ে যেতে থাকে।

হঠাৎ একদিন ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ভুগে যখন কথক সুস্থ হয়ে উঠবেন তখন মন থেকে মৃত নক্ষত্রের মতো মুছে গেছে যামিনীর নাম, মুছে গেছে তেলেনাপোতার স্মৃতি।

সবই তাঁর কাছে ধোঁয়াশা মনে হবে, মন হবে যেন তেলেনাপোতা বলে সত্যই কিছু নেই, সবই অসম্ভব এক কুয়াশাচ্ছন্ন কল্পনা যেন।
কিছুক্ষণের জন্য তেলেনাপোতা আবিষ্কৃত হয়ে আবার রাতের অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।