niladhwajer-prati-jana-kobitar-bisoybostu
Class-11

নীলধ্বজের প্রতি জনা – কবিতার বিষয়বস্তু

বাংলাএকাদশ শ্রেনি – নীলধ্বজের প্রতি জনা (দ্বিতীয় পর্ব)


মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত নীলধ্বজের প্রতি জনা কবিতাটি আমরা মোট তিনটি পর্বে আলোচনা করেছি। প্রথম পর্বে আলোচিত হয়েছে কাব্য পরিচিতি।

এই পর্বে আমরা কবিতার কবিতার বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

নীলধ্বজের প্রতি জনা – কবিতার বিষয়বস্তু

সমগ্র কবিতাটিতে মোট সাতটি স্তবক আছে।

এর পৌরাণিক অনুষঙ্গ অনেক বৃহৎ হওয়ায় স্তবক ধরে ধরে প্রথমে সারসংক্ষেপ করে দেওয়া হবে। তারপর বিশদে আলোচনায় প্রবেশ করবো আমরা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ‘নীলধ্বজের প্রতি জনা’-র আলোচনায় আমরা একে পত্রকবিতা বলেই চিহ্নিত করতে চাইবো যার কাহিনির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ মহাভারতকে কেন্দ্র করে। মূলত চারটি চরিত্রকে ঘিরে এই পত্রকবিতা দানা বেঁধেছে – নীলধ্বজ, নীলধ্বজের স্ত্রী জনা, জনার পুত্র প্রবীর এবং অর্জুন। কিন্তু সক্রিয়ভাবে কবিতার মধ্যে জনাকেই প্রধানরূপে দেখা যায়। নাটকীয় স্বগতোক্তির মতো জনা অদৃশ্য অনুপস্থিত নীলধ্বজকে কেন্দ্র করে চিঠিতে বলে চলেছে নিজের বেদনার কথা, নীলধ্বজের প্রতি তাঁর সমস্ত অভিযোগ-অনুযোগের কথাও সে জানিয়েছে এই চিঠিতে। কিন্তু কবিতা পড়তে পড়তে আমরা বুঝতে পারি এ শুধু লেখা নয়, নীলধ্বজকে সামনে দাঁড় করিয়ে জনা যেন তাঁর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাচ্ছেন, নীলধ্বজকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছেন বারবার।


একাদশ শ্রেণি থেকে→ Physics | Chemistry Biology | Computer

পত্রকবিতার শুরুতেই মধুসূদন একটি বর্ণনার মধ্য দিয়ে মূল কাহিনিতে প্রবেশের আগে চূর্ণক রচনা করেছেন। বর্ণনায় দেখা যায়, মহাভারতের অশ্বমেধ যজ্ঞের কাহিনির অন্তর্গত এই আখ্যান। পাণ্ডবদের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া মাহেশ্বরী পুরীর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় যুবরাজ প্রবীর তাকে বন্দি করে। সেকালে নিয়ম ছিল অশ্বমেধের ঘোড়া যে যে রাজ্যের উপর দিয়ে অতিক্রম করবে হয় সেই রাজ্যকে বশ্যতা স্বীকার করতে হবে, নচেৎ যুদ্ধ করতে হবে। আত্মদর্পী প্রবীর বশ্যতা নয়, যুদ্ধ চেয়েছিলেন। কিন্তু হতভাগ্য সে। যুদ্ধে কৌশলী অর্জুনের কাছে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু প্রবীরের পিতা মাহেশ্বরী পুরীর রাজা নীলধ্বজ পুত্রের মৃত্যুর প্রতিশোধ না নিয়ে অন্যায়ভাবে অর্জুনের সঙ্গে সন্ধি করতে উদ্যত হন। পুত্রশোক যেন তাঁর গায়ে আঁচ কাটেনি। অন্যদিকে প্রবীরের মা জনা পুত্রশোকে আকুল হয়ে স্বামীর এরূপ হীন আচরণে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছেন এবং সেজন্য নীলধ্বজের উদ্দেশে এই পত্র লিখেছেন জনা। বর্ণনার শেষে মধুসূদন মহাভারতের অশ্বমেধ পর্ব পাঠ করে সবিস্তারে কাহিনিটি জেনে নিতে বলেছেন উৎসাহী পাঠকদের। তাহলে আগে দেখে নেওয়া যাক স্তবক অনুসারে কাহিনি কীভাবে এগিয়েছে।

প্রথম স্তবক

বাজিছে রাজ-তোরণে রণবাদ্য আজি;
হ্রেষে অশ্ব, গর্জে গজ, উড়িছে আকাশে
রাজকেতু! মুহূম্মুহুঃ হুঙ্কারিছে মাতি
রণমদে রাজসৈন্য!-কিন্তু কোন্ হেতু?
সাজিছ কি, নররাজ, যুঝিতে সদলে –
প্রবীর পুত্রের মৃত্যু প্রতিবিধিৎসিতে, –
নিবাইতে এ শোকাগ্নি ফাল্গুনীর লোহে?
এই তো সাজে তোমারে, ক্ষত্রমণি তুমি,
মহাবাহু! যাও বেগে গজরাজ যথা
যমদণ্ডসম শুণ্ড আস্ফালি-নিনাদে!
টুট কিরীটির গর্ব আজি রণস্থলে!
খণ্ডমুণ্ড তার আন শূলদণ্ড-শিরে!
অন্যায় সমরে মূঢ় নাশিল বালকে।
নাশ, মহেম্বাস, তারে! ভুলিব এ জ্বালা,
এ বিষম জ্বালা, দেব, ভুলিব সত্বরে।
জন্মে মৃত্যু, – বিধাতার এ বিধি জগতে।
ক্ষত্রকুল-রত্ন পুত্র প্রবীর সুমতি,
সম্মুখ-সমরে পড়ি, গেছে স্বর্গধামে, –
কি কাজ বিলাপে, প্রভু? পাল মহীপাল,
ক্ষত্রধর্ম, ক্ষত্রকর্ম সাধ ভুজবলে।

মাহেশ্বরী পুরীর যুদ্ধক্ষেত্রে রণবাদ্য বেজে উঠেছে। অশ্বের হ্রেষা, গজের বৃংহন, প্রতি মুহূর্তে সৈন্যদের হুঙ্কারে আকাশ-বাতাস মন্দ্রিত হচ্ছে। যুদ্ধের সাজ সাজো রব। জনা এই অবসরে প্রশ্ন করছেন নীলধ্বজকে, এত আয়োজন কিসের জন্য? পুত্র প্রবীরের মৃত্যুর প্রতিবিধানের জন্য, পুত্রহন্তার উপর প্রতিশোধ নিতেই কি নীলধ্বজ যুদ্ধসাজে সজ্জিত হচ্ছেন?

নীলধ্বজ কি তাহলে ফাল্গুনী অর্জুনের রক্তে নেভাতে চান জনার পুত্রশোক? অবোধ জনা এই কারণগুলি বিশ্বাস করে নীলধ্বজকে প্ররোচিত করেন যুদ্ধের জন্য। ক্ষত্রিয়কুলের শ্রেষ্ঠ রাজা নীলধ্বজের উচিত হাতির মতো পায়ে পিষ্ট করে দেওয়া শত্রুকে। কিরীটি অর্জুনের গর্ব যেন নীলধ্বজ সমূলে চূর্ণ করেন এবং জনা চান যেন নীলধ্বজ অর্জুনের খণ্ড মুণ্ড শূলে বিদ্ধ করে নিয়ে আসেন রণক্ষেত্র থেকে। পুত্রশোকে ক্ষিপ্ত জনা এরপরে প্রবীর হত্যার কাহিনি বলতে থাকেন। বালক প্রবীরকে অন্যায় যুদ্ধে হত্যা করেছেন অর্জুন। তাই অর্জুনের মৃত্যুতেই জনা পুত্রশোকের বিষম জ্বালা ভুলতে চান। মানুষের জন্ম হলে, মৃত্যুও অবশ্যম্ভাবী। এটাই বিধাতার নিয়ম। কিন্তু ক্ষত্রিয়কুলের রত্ন প্রবীর সম্মুখ-সমরে মৃত, স্বর্গগত। জনা বলছেন, এই সময়ে পিতা হিসেবে নীলধ্বজের বিলাপ করে কোনো লাভ নেই, বরং তাঁর উচিত ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করা।

দ্বিতীয় স্তবক

হায়, পাগলিনী জনা! তব সভামাঝে
নাচিছে নর্তকী আজি, গায়ক গাইছে,
উথলিছে বীণাধ্বনি! তব সিংহাসনে
বসিছে পুত্রহা রিপু-মিত্রোত্তম এবে!
সেবিছ যতনে তুমি অতিথি-রতনে।

এই অংশের বক্তা কবি স্বয়ং।

কথকের ভূমিকায় জনার অসহায়তা প্রকাশ করেছেন তিনি। জনা শত প্ররোচনায় নীলধ্বজকে যুদ্ধের জন্য উদ্দীপিত করতে চাইলেও তা আসলে বাস্তবায়িত হয় না। রাজসভায় নর্তকীরা নাচে, গায়ক গান গায়, বীণার তন্ত্রীতে সুর ওঠে আনন্দের। আর নীলধ্বজের সিংহাসনে এসে বসেন পুত্রহন্তা শত্রু অর্জুন যেন তিনি রাজার পরম আত্মীয়, পরম বন্ধু। অর্জুনকে অতিথির মতো সেবা-যত্ন করেন নীলধ্বজ।

তৃতীয় স্তবক

কি লজ্জা! দুঃখের কথা, হায় কব কারে?
হতজ্ঞান আজি কি হে পুত্রের বিহনে,
মাহেশ্বরী-পুরীশ্বর নীলধ্বজ রথী?
যে দারুণ বিধি, রাজা, আঁধারিলা আজি
রাজ্য, হরি পুত্রধনে, হরিলা কি তিনি
জ্ঞান তব? তা না হলে, কহ মোরে কেন
এ পাষণ্ড পাণ্ডুরথী পার্থ তব পুরে
অতিথি? কেমন তুমি, হায়, মিত্রভাবে
পরশ সে কর, যাহা প্রবীরের লোহে
লোহিত? ক্ষত্রিয়ধর্ম এই কি, নৃমণি?
কোথা ধনুঃ, কোথা তৃণ, কোথা চর্ম অসি?
না ভেদি রিপুর বক্ষঃ তীক্ষ্ণ তম সরে
রণক্ষেত্রে, মিষ্টালাপে তুষিছ কি তুমি
কর্ণ তার সভাতলে? কি কহিবে, কহ, –
যবে দেশ-দেশান্তরে জনরব লবে
এ কাহিনি, কি কহিবে ক্ষত্রপতি যত?

জনার স্বগতোক্তি শুরু হয়।

লজ্জায় তাঁর এই দূর্দিনের দুঃখের কথা তিনি কাকেই বা জানাবেন। পুত্রশোকে জ্ঞানহারা হয়েছেন নীলধ্বজ। বিধাতার কুটিল কালো মেঘে অন্ধকার হয়েছে আজ মাহেশ্বরী পুরীর আকাশ। তাই কি পুত্রকে হারিয়ে নীলধ্বজ রাজা নিজের স্বাভাবিক বোধ-জ্ঞানও হারিয়ে গিয়েছে?

জনা প্রশ্ন করেন তাঁর স্বামীকে। জনা বুঝতে পারেন না এই দুঃসময়ে কেন নীলধ্বজের রাজসভায় অতিথি হয়ে এসেছেন অর্জুন। কীভাবে অর্জুনের পুত্রঘাতী হাত স্পর্শ করেন নীলধ্বজ? প্রবীরের রক্তের দাগ যেন এখনো অর্জুনের হাতে। জনা প্রশ্ন করেন এটাই কি ক্ষত্রিয়ধর্ম? ধনু নেই, তূণ নেই, অসি নেই – শত্রুকে হত্যা করে রণক্ষেত্রে নীলধ্বজ কোথায় পুত্রের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবেন, তা না করে রাজসভায় অতিথির মতো অর্জুনকে মিষ্টকথায় তুষ্ট করতে চাইছেন নীলধ্বজ। জনা বুঝতে পারেন না, যখন দেশে দেশে এই কাহিনি রটে যাবে, নীলধ্বজের সম্মান-ক্ষত্রিয়কুলের গৌরব কোথায় থাকবে!


একাদশ শ্রেণি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

চতুর্থ স্তবক

নরনারায়ণ-জ্ঞানে, শুনিনু, পূজিছ
পার্থে, রাজা, ভক্তি ভাবে; – এ কি ভ্রান্তি তব?
হায়, ভোজবালা কুস্তী – কে না জানে তারে,
স্বৈরিণী? তনয় তার জারজ অর্জুনে
(কি লজ্জা,) কি গুণে তুমি পূজ রাজরথি,
নরনারায়ণ-জ্ঞানে? রে দারুণ বিধি,
এ কি লীলাখেলা তোর, বুঝিব কেমনে?
একমাত্র পুত্র দিয়া নিলি পুনঃ তারে
অকালে! আছিল মান, তাও কি নাশিলি?
নরনারায়ণ পার্থ? কুলটা যে নারী –
বেশ্যা-গর্ভে তার কি হে জনমিলা আসি
হুষীকেশ? কোন্ শাস্ত্রে, কোন্ বেদে লেখে-
কি পুরাণে কাহিনি? দ্বৈপায়ন ঋষি
পাণ্ডব-কীর্তন গান গায়েন সতত।
সত্যবর্তীসূত ব্যাস বিখ্যাত জগতে।
ধীবর জননী, পিতা ব্রাহ্মণ! করিলা
কামকেলি লয়ে কোলে ভ্রাতৃবধূদ্বয়ে,
ধর্মমতি! কি দেখিয়া, বুঝাও দাসীরে
গ্রাহ্য কর তাঁর কথা, কুলাচার্য তিনি
কু-কুলের? তবে যদি অবতীর্ণ ভবে
পার্থরূপে পীতাম্বর, কোথা পদ্মালয়া
ইন্দিরা? দ্রৌপদী বুঝি? আঃ মরি, কি সতী!
শাশড়ির যোগ্য বধূ! পৌরব-সরসে
নলিনী! অলির সখী, রবির অধীনী,
সমীরণ-প্রিয়া! ধিক্‌! হাসি আসে মুখে,
(হেন দুঃখে) ভাবি যদি পাঞ্চালীর কথা!
লোক-মাতা রমা কি হে এ ভ্ৰষ্টা রমণী?

অন্তঃপুরবাসিনী হয়েও জনা জানতে পেরেছেন নীলধ্বজ নরনারায়ণ-জ্ঞানে সেবা করছেন অরজ্রুনের। এই ভক্তি কি আসলে নীলধ্বজের মতিভ্রমের ফল?

এরপরে অর্জুনের পরিবার, তাঁর জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে ক্ষিপ্ত জনা বিরূপ মন্তব্য করবেন পরপর। রাজা ভোজের কন্যা কুন্তীকে তিনি ‘স্বৈরিণী’ অর্থাৎ পতিতা নারী রূপে সম্বোধন করে বলেন অর্জুন আসলে কুন্তীর জারজ সন্তান। আর তাকেই কিনা ভক্তিভরে সেবা-যত্ন করছেন নীলধ্বজ? একি বিধাতার লীলাখেলা?

একমাত্র পুত্র প্রবীরকে অকালে হরণ করে নিল মৃত্যু। যেটুকু সম্মান ছিল, ক্ষত্র-গৌরব ছিল জনার তাও হয়তো চলে গেল। আসলে জনা নীলধ্বজের এই আচরণে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছেন। পার্থকে নরনারায়ণ জ্ঞানে যে পূজা করছেন নীলধ্বজ, তিনি তো জন্মেছেন এক পতিতার গর্ভে। নীলধ্বজকে তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে জনা জানতে চান কোন পুরাণে-কোন শাস্ত্রে লেখা আছে যে পতিতার গর্ভে হৃষীকেশ অর্থাৎ নারায়ণের জন্ম হয়েছে? ঋষি দ্বৈপায়ন অর্থাৎ মহাভারতের রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাস সর্বদাই পাণ্ডবের গুণগান করেন, প্রশংসা করেন। জনা মহর্ষিকেও কটূ মন্তব্য করতে ছাড়েননি। সত্যবতীর পুত্র হিসেবেই বেদব্যাস জগতে বিখ্যাত হয়েছেন। তাঁর মা সত্যবতী এক ধীবর কন্যা আর পিতা ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ পরাশর মুনি। সেই ব্যাসের চরিত্রও কলঙ্কিত। ভ্রাতৃবধূর সঙ্গে রতিক্রিয়া করেছেন তিনি। জনা তাঁকে কু-কুলের আচার্য্য বলে সম্বোধন করেন। জনা আশ্চর্য হন এই ভেবে যে অর্জুনের বেশে যদি স্বয়ং নারায়ণ অবতীর্ন হয়ে থাকেন, তবে ইন্দিরা কি অর্জুন-পত্নী দ্রৌপদী? বিদ্রুপ করে ওঠেন জনা। দ্রৌপদী নাকি সতী! শাশুড়ির কুন্তীর মতোই দ্রৌপদী যেন পুরুবংশের সরোবরে পদ্ম। একইসঙ্গে তিনি মৌমাছির সখী, সূর্যের অধীন এবং বাতাসের প্রিয়া। প্রবল ধিক্কারে বিদ্ধ করেন জনা পাণ্ডব-পত্নী দ্রৌপদীকে। পাঞ্চালীকে তিনি ভ্রষ্টা রমণী বলে সম্বোধন করেন।

পঞ্চম স্তবক

জানি আমি কহে লোক রথিকুল-পতি
পার্থ। মিথ্যা কথা, নাথ! বিবেচনা কর,
সূক্ষ্ম বিবেচক তুমি বিখ্যাত জগতে। –
ছদ্মবেশে লক্ষ রাজে ছলিল দুর্মতি
স্বয়ন্বরে। যথাসাধ্য কে যুঝিল, কহ,
ব্রাহ্মণ ভাবিয়া তারে, কোন্ ক্ষত্ররথী,
সে সংগ্রামে? রাজদলে তেঁই সে জিতিল
দহিল খাণ্ডব দুষ্ট কৃষ্ণের সহায়ে।
শিখণ্ডীর সহকারে কুরুক্ষেত্র রণে
পৌরব-গৌরব ভীষ্ম বৃদ্ধ পিতামহে
সংহারিল মহাপাপী! দ্রোণাচার্য গুরু, –
কি কুছলে নরাধম বধিল তাহারে,
দেখ স্মরি? বসুন্ধরা গ্রাসিলা সরোষে
রথচক্র যবে, হায়; যবে ব্রহ্মশাপে
বিকল সমরে, মরি কর্ণ মহাযশাঃ,
নাশিল বর্বর তাঁরে। কহ মোরে, শুনি,
মহারথী-প্রথা কি হে এই, মহারথি?
আনায়-মাঝারে আনি মৃগেন্দ্রে কৌশলে
বধে ভীরুচিত ব্যাধ, সে মৃগেন্দ্র যবে
নাশে রিপু, আক্রমে সে নিজ পরাক্রমে!
কি না তুমি জান রাজা? কি কব তোমারে?
জানিয়া শুনিয়া তবে কি ছলনে ভুল
আত্মশ্লাঘা, মহারথি? হায় রে কি পাপে,
রাজ-শিরোমণি রাজা নীলধ্বজ আজি
নতশির,-হে বিধাতঃ!-পার্থের সমীপে?
কোথা বীরদর্প তব? মানদৰ্প কোথা?
চণ্ডালের পদধুলি ব্রাহ্মণের ভালে?
কুরঙ্গীর অশ্রুবারি নিবায় কি কভু
দাবানলে? কোকিলের কাকলী-লহরী
উচ্চনাদী প্রভঞ্জনে নীরবয়ে কবে?
ভীরুতার সাধনা কি মানে বলবাহু?

পার্থকে সকলেই রথিকুলপতি অর্থাৎ ক্ষত্রিয়কুলের সম্মান-গৌরবের প্রতিভূ বলে মনে করেন। জনা একথা মানতে চান না। নীলধ্বজের বিবেচনা বোধের উপরে আস্থা রাখেন জনা। যে অর্জুন ছদ্মবেশে দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় সমস্ত পাণিপ্রার্থী রাজাদের ছলনা করলো, ব্রাহ্মণের বেশে থাকায় ক্ষত্রিয়ের মতো যার সঙ্গে কেউই সেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলো না তাকে কিভাবে শ্রেষ্ঠ বলা যায় জানেন না জনা।

সমস্ত রাজাদের মধ্যে দ্রৌপদীকে জয় করে আনলো সেই অর্জুন আর তারপরে কৃষ্ণের সঙ্গে পরামর্শ করে খাণ্ডব বন পুড়িয়ে দিল। তাঁর কু-কীর্তি এখানেই শেষ নয়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শিখণ্ডীকে সামনে রেখে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মকে হত্যা করেন অর্জুন। এমনকি গুরু দ্রোণাচার্য্যকেও কীভাবে অর্জুন হত্যা করেছেন তা নীলধ্বজকে স্মরণ করতে বলেছেন জনা। আবার ব্রহ্মণ পরশুরামের অভিশাপে যখন কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে গিয়েছিল, তখন সুযোগ-সন্ধানী এই অর্জুন তাঁকে ক্ষত্রিয়ধর্ম না মেনে হত্যা করে অন্যায়ভাবে। জনা প্রশ্ন করছেন এটাই কী তাহলে মহারথী প্রথা? পশুরাজ সিংহকে ফাঁদের মধ্যে বন্দি করে তারপর তাকে হত্যা করে ভীরু ব্যাধ আর সেই সিংহ শিকার করে স্বীয় পরাক্রমে। নীলধ্বজ রাজা তো সবই জানেন। তাহলে কি সব জেনেশুনেও ছলনায় তিনি নিজের গৌরব, আত্মশ্লাঘা ভুলে গিয়েছেন?


আরো পড়ো → ডাকাতের মা গল্পের বিষয়বস্তু

জনা হতাশ হয়ে বলেছেন কোন এক অজানা পাপে নীলধ্বজ রাজা আজ নতশির শত্রু অর্জুনের সামনে। তাঁর বীরদর্প নেই, মান নেই, তেজও লুপ্ত। জনা বলছেন এ যেন চণ্ডালের পদধূলি এসে পড়েছে ব্রাহ্মণের কপালে। জনা জানেন কমণ্ডলুর ঐ সামান্য জল কখনোই একটা দাবানল নেভাতে পারে না। কোকিলের কল-কূজন কবেই বা তীব্র নিনাদকে নীরব করে রাখতে পেরেছে? বলবাহু কখনোই ভীরুতাকে মান্য করে না।


একাদশ শ্রেণি থেকে → অর্থনীতি | ভূগোল

ষষ্ঠ স্তবক

কিন্তু বৃথা এ গঞ্জনা। গুরুজন তুমি;
পড়িব বিষম পাপে গঞ্জিলে তোমারে।
কুলনারী আমি, নাথ, বিধির বিধানে
পরাধীন! নাহি শক্তি মিটাই স্ববলে
এ পোড়া মনের বাঞ্ছা! দুরন্ত ফাল্গুনী।
(এ কৌত্তেয়-যোধে ধাতা সৃজিলা নাশিতে
বিশ্বসুখ!) নিঃসন্তানা করিল আমারে!
তুমি পতি, ভাগ্যদোষে বাম মম প্রতি
তুমি! কোন সাধে প্রাণ ধরি ধরাধামে?
হায় রে, এ জনাকীর্ণ ভবস্থল আজি
বিজন জনার পক্ষে! এ পোড়া ললাটে
লিখিলা বিধাতা যাহা, ফলিল তা কালে! –
হা প্রবীর! এই হেতু ধরিনু কি তোরে,
দশ মাস দশ দিন, নানান যত্ন সয়ে,
এ উদরে? কোন্ জন্মে কোন্ পাপে পাপী
তোর কাছে অভাগিনী, তাই দিলি বাছা,
এ তাপ? আশার লতা তাই রে ছিঁড়িলি!-
হা পুত্র! শোধিলি কি রে তুই এইরূপে
মাতৃধার? এই কি রে ছিল তোর মনে?-
কেন বৃথা, পোড়া আঁখি, বরফিস্ আজি
বারিধারা? রে অবোধ, কে মুছিবে তোরে?
কেন বা জ্বলিস মনঃ? কে জুড়াবে আজি
বাক্য-সুধারসে তোরে? পাণ্ডবের শরে
খণ্ড শিরোমণি তোর; বিবরে লুকায়ে,
কাঁদি খেদে, মর্‌, অরে মণিহারা ফণি!-

কিন্তু জনা বুঝতে পারেন নীলধ্বজকে তাঁর এই গঞ্জনা বৃথা। তিনি গুরুজন, তাঁকে গঞ্জনা করলে জনার পাপ হবে। জনা তো কুলনারী, বিধাতার অমোঘ নিয়মে তিনি পরাধীন। তাই তাঁর পোড়া মনের ইচ্ছা মেটাবেন এমন ক্ষমতা তাঁর নেই। অর্জুন তাঁকে নিঃসন্তান করেছে। জনার হতাশা-মথিত কণ্ঠে শোনা যায়, কৌন্তেয় অর্জুনকে বিধাতা আসলে সব বিশ্বসুখ ধ্বংস করতেই তৈরি করেছেন যেন। ভাগ্যের পরিহাসে জনার স্বামী নীলধ্বজ জনার প্রতি বিরূপ।


আরো পড়ো → তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের সারসংক্ষেপ

আর কোন ইচ্ছায় জনা প্রাণধারণ করবেন?

পুত্র নেই। স্বামীর ভালোবাসা বা অবলম্বনও নেই। তাই এই পৃথিবী জনার কাছে বিজন-নির্জন-একাকী হয়ে উঠেছে। বিধাতার নিয়মেই সব হয়েছে বলে জনার বিশ্বাস। প্রবীরকে কি তিনি এই জন্যেই দশ মাস দশ দিন নিদারুণ যন্ত্রণায় গর্ভে ধারণ করেছিলেন? তাঁর পুত্র প্রবীরের কাছে কী পাপ করেছিলেন জনা যার দরুণ তাঁকে আজ এই বেদনার ভার নিতে হচ্ছে? মাতৃঋণ তবে কি প্রবীর এইভাবে নিজের মৃত্যুতে পরিশোধ করলো? জনার মনে বারবার অজস্র প্রশ্ন ভিড় করে আসে। জনার চোখে অশ্রুধারা বয়ে যায়, সেই অশ্রু মোছাবার কেউ নেই আজ জনার পাশে। তাঁকে সান্ত্বনা দেবার কেউ নেই আজ। পাণ্ডবের শরে বিদ্ধ হয়েছে তাঁর শিরোমণি প্রবীরের দেহ। গোপনে গোপনে সেই শোকে মণিহারা ফণীর মতো জনা কাঁদেন।

সপ্তম স্তবক

যাও চলি, মহাবল, যাও কুরুপুরে
নব মিত্র পার্থ সহ! মহাযাত্রা করি
চলিল অভাগী জনা পুত্রের উদ্দেশে!
ক্ষত্রকুলবালা আমি; ক্ষত্র-কুলবধূ;
কেমনে এ অপমান সব ধৈর্য ধরি?
ছাড়িব এ পোড়া প্রাণ জাহ্নবীর জলে!
দেখিব বিস্মৃতি যদি কৃতান্তনগরে
লভি অন্তে! যাচি চির-বিদায় ও পদে।
ফিরি যবে রাজপুরে প্রবেশিবে আসি,
নরেশ্বর, “কোথা জনা?” বলি ডাক যদি
উত্তরিবে প্রতিধ্বনিকোথা জনা?” বলি!

অর্জুনের সঙ্গে নীলধ্বজকে পাণ্ডবের হস্তিনাপুরে চলে যেতে বলেন জনা। আর জনা যাবেন মহাযাত্রায়, তাঁর পুত্রের উদ্দেশে। ক্ষত্রকুলবালা হয়ে এই অপমান তিনি কিছুতেই ভুলতে পারেন না। সেই অভাগিনী জনা জাহ্নবীর জলে আত্মবিসর্জন দিতে চান। মৃত্যুদূত যমের কাছে গিয়ে তিনি যেন ভুলে যেতে পারেন এই নিদারুণ শোক। নীলধ্বজের কাছে এই পত্রের মাধ্যমে জনা চিরবিদায় প্রার্থনা করছেন। নীলধ্বজ যখন মাহেশ্বরী পুরীতে ফিরে আসবেন, জনাকে খুঁজবেন তখন শুধুই তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে যাবে রাজপুরীর ভিতরে।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → নীলধ্বজের প্রতি জনা পৌরাণিক ব্যাখ্যা


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতিঃ

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –