taper-porimap-ekok
WB-Class-8

তাপের পরিমাপ ও একক

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বিজ্ঞান । অধ্যায় – তাপ(প্রথম পর্ব)


আগের পর্বে আমরা জেনেছি যোজ্যতা ও রাসায়নিক বন্ধন সম্পর্কে। এই পর্বে আমরা আলোচনা করবো তাপের পরিমাপ ও তার একক সম্পর্কে।

তাপ কি?

তাপ হল এক রকম শক্তি। আলোর মত তাপও অদৃশ্য এবং এটি তরঙ্গধর্মী।

অর্থাৎ উৎস থেকে তরঙ্গের আকারে তাপ অন্য স্থানে সঞ্চালিত হয়।
কোন পদার্থে বর্তমান অণুগুলির গতিশক্তি বৃদ্ধি করা গেলে পদার্থটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, আবার যদি অণুগুলির গতিশক্তি হ্রাস পায়, তাহলে পদার্থটি ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

অন্যভাবে বলা যায় যে, তাপ প্রয়োগ করলে পদার্থের অণুর গতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তাপ যদি পদার্থ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলে অণুগুলির গতিশক্তি হ্রাস পায়।

বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায় যে তাপ সৃষ্টি করতে হলে শক্তি প্রয়োজন হয়। শক্তির অবিনশ্বর সূত্র মেনে এই প্রযুক্ত শক্তি তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগ – বাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

তাপের সংজ্ঞা

তাপের সংজ্ঞা হিসাবে আমরা বলতে পারি যে; তাপ হল একরকম শক্তি, যা গ্রহণ করলে বস্তু উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বর্জন করলে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ক্যালোরিমিটার যন্ত্রের সাহায্যে তাপ পরিমাপ করা যায়।

তাপের একক

CGS পদ্ধতিতে তাপের একক ক্যালোরি (Calorie)।

SI পদ্ধতিতে তাপের একক হল জুল (Joule)।
1 ক্যালোরি = 4.2 জুল।

এছাড়া FPS পদ্ধতিতে তাপের একক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট। 1 ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট = 252 ক্যালোরি। এছাড়া তাপ পরিমাপের একটি বড় একক হল থার্ম। 1 থার্ম = 1 লক্ষ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট।

এক ক্যালোরি কাকে বলে?

এক গ্রাম বিশুদ্ধ জলের উষ্ণতা 1˚C বৃদ্ধি করতে যে পরিমাণ তাপের প্রয়োজন হয়, সেই পরিমাণ তাপকে এক ক্যালোরি বলে।

তাপ কয় প্রকার ও কি কি?

তাপকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়,
বোধগম্য তাপ, লীন তাপ ও বিকীর্ণ তাপ।

বোধগম্য তাপ কাকে বলে?

যে তাপ প্রয়োগ করলে কোন বস্তুর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না, কিন্তু তাপমাত্রা বা উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়, তাকে বোধগম্য তাপ বলে।

কোন পাত্রে জল নিয়ে আগুনে বসালে তা ক্রমে গরম হতে থাকে, অর্থাৎ তার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাপমাত্রার এই পরিবর্তন থার্মোমিটারে দেখা যায়।

বোধগম্য তাপের সঞ্চারণের ফলে রান্না হয়

লীন তাপ কাকে বলে?

যে তাপ কোন বস্তুর উপর প্রয়োগ করা হলে বস্তুর তাপমাত্রা বা উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় না, কিন্তু বস্তুর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে তাকে লীন তাপ বা Latent heat বলে।

0˚C তাপমাত্রার বরফ গলে 0˚C এর জল উৎপন্ন হতে প্রয়োজনীয় লীন তাপ হল 80 ক্যালোরি/গ্রাম।

লীনতাপের প্রভবে বরফের গলন ঘটে

এই লীন তাপ থার্মোমিটার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

বিকীর্ণ তাপ কাকে বলে?

যে তাপ মাধ্যম ছাড়া বা উপস্থিত মাধ্যমকে উত্তপ্ত না করে বিকিরণ প্রণালীতে উৎস থেকে সঞ্চালিত হয়, তাকে বিকীর্ণ তাপ বলা হয়। সূর্য থেকে যে তাপ পৃথিবীতে আসে তা হল বিকীর্ণ তাপ।

সূর্য থেকে আগত বিকীর্ণ তাপ সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহে ছড়িয়ে পড়ে

তাপ ও তাপমাত্রা কি এক জিনিস?

না, তাপ ও তাপমাত্রা এক জিনিস হয়।তাপমাত্রা বা উষ্ণতা হল বস্তুর এমন এক তাপীয় অবস্থা, যা স্থির করে দেয় দুটি বস্তু পরস্পরের সংস্পর্শে থাকা অবস্থায় প্রথম বস্তুটি দ্বিতীয় বস্তু থেকে তাপ গ্রহণ করবে, নাকি প্রথম বস্তু থেকে দ্বিতীয় বস্তুটি তাপ গ্রহণ করবে।

তাপমাত্রার পরিমাপ ও তার একক

থার্মোমিটার যন্ত্রের সাহায্যে তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়।
সেলসিয়াস (Celsius), ফারেনহাইট (Fahrenheit), কেলভিন (Kelvin) প্রভৃতি তাপমাত্রার একক।
0˚C = 32˚F = 273 K

কোন বস্তুর উষ্ণতা বা তাপমাত্রা বৃদ্ধি কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে?

কোন বস্তুর উষ্ণতা বা তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে কি পরিমাণ তাপ প্রয়োজন, তা তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে, বস্তুর ভর, বস্তুর উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ, বস্তুর উপাদান বা প্রকৃতি।

বস্তুর ভর

নির্দিষ্ট পরিমাণ উষ্ণতা বৃদ্ধি বা হ্রাসের জন্য একই পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন ভরের বস্তু ভিন্ন পরিমাণ তাপ গ্রহণ বা বর্জন করে। এই গৃহীত বা বর্জিত তাপের পরিমাণ বস্তুর ভরের সাথে সমানুপাতিক হয়।

বস্তুর উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ

কোন বস্তু কি পরিমাণ তাপ গ্রহণ বা বর্জন করবে তা ওই বস্তুর উষ্ণতা বৃদ্ধি বা হ্রাসের পরিমাণের উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ বস্তু দ্বারা গৃহীত বা বর্জিত তাপের পরিমাণ বস্তুটির উষ্ণতা বৃদ্ধি বা হ্রাসের সাথে সমানুপাতিক।

বস্তুর উপাদান বা প্রকৃতি

কোন বস্তু কি পরিমাণ তাপ গ্রহণ বা বর্জন করবে তা বস্তুটি যে পদার্থ দিয়ে তৈরি তার প্রকৃতির উপরও নির্ভর করে। পদার্থের এই বিশেষ ধর্মকে তার আপেক্ষিক তাপ (Specific heat) বলা হয়।

আপেক্ষিক তাপ কাকে বলে?

কোন পদার্থের একক ভরের উষ্ণতা এক ডিগ্রি বৃদ্ধি করতে যে পরিমাণ তাপ প্রয়োজন হয়, তাকে ওই পদার্থের আপেক্ষিক তাপ বলে।

subscribe-jump-magazine-india

আপেক্ষিক তাপের একক

CGS পদ্ধতিতে আপেক্ষিক তাপের একক হল Cal/gm˚C। এক গ্রাম ভরের কোন পদার্থের উষ্ণতা 1˚C বৃদ্ধি করতে যত ক্যালোরি তাপ প্রয়োজন হয়, CGS পদ্ধতিতে তাকে ওই পদার্থের আপেক্ষিক তাপ বলে। CGS পদ্ধতিতে জলের আপেক্ষিক তাপ 1 Cal/gm˚C।

SI পদ্ধতিতে আপেক্ষিক তাপের একক J/Kg˚C অর্থাৎ জুল পার কেজি পার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।

SI পদ্ধতিতে জলের আপেক্ষিক তাপ 4200 J/Kg˚C। এছাড়া J/Kg K হল SI পদ্ধতির অন্য একক।

সকল পদার্থের আপেক্ষিক তাপের পরিমাণ সমান হয় না।

সম পরিমাণ দুধ ও জল এক প্রকার দুটি পাত্রে নিয়ে একই ভাবে উত্তপ্ত করা হলে দেখা যায় যে জলের তুলনায় দুধের উষ্ণতা বেশী বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ হল জলের আপেক্ষিক তাপ দুধ অপেক্ষা বেশী।

সেঁক দেওয়ার কাজে জল বেশী উপযোগী কেন?

জলের আপেক্ষিক তাপ অন্যান্য তরল অপেক্ষা বেশী হওয়ার কারণে এর তাপগ্রহণ এবং তাপধারণের ক্ষমতা বেশী হয়। তাই সেঁক দেওয়ার কাজে অন্য তরল অপেক্ষা জল বেশী উপযোগী।

কোন বস্তু দ্বারা গৃহীত বা বর্জিত তাপের পরিমাণ বস্তুর ভর, আপেক্ষিক তাপ ও উষ্ণতা পরিবর্তনের গুণফলের সমান হয়।

ধরা যাক m ভরের কোন বস্তুর উষ্ণতা t11˚C থেকে বৃদ্ধি করে t22˚C করা হল। যদি বস্তুটির আপেক্ষিক তাপ s হয়, তাহলে বস্তু দ্বারা গৃহীত তাপের পরিমাণ (Q) হবে:
Q = m × s × (t2 – t1)

উদাহরণ 1

500 gm ভরের অ্যালুমিনিয়াম এর উষ্ণতা 5˚C বৃদ্ধি করা হল। অ্যালুমিনিয়ামের আপেক্ষিক তাপ 897 J/Kg K হলে গৃহীত তাপের পরিমাণ নির্ণয় কর।

⇒ ভর (m) = 500 gm = 0.5 Kg
তাপামাত্রা পরিবর্তন (t2 – t1) = 5˚C
আপেক্ষিক তাপ (s) = 897 J/Kg K
∴ গৃহীত তাপ (Q) = m × s × (t2 – t1)
= 0.5 × 897 × 5
= 2242.5 J
∴ গৃহীত তাপের পরিমাণ 2242.5 J (উত্তর)

উদাহরণ 2

0.6 Kg বালির উষ্ণতা 20˚C থেকে 80˚C তে বৃদ্ধি করা হল। কি পরিমাণ তাপ গৃহীত হল নির্ণয় কর। (বালির আপেক্ষিক তাপ 830 J/Kg ˚C)।

⇒ বালির ভর (m) = 0.6 Kg
আপেক্ষিক তাপ (s) = 830 J/Kg ˚C
প্রাথমিক উষ্ণতা (t1) = 20˚C
অন্তিম উষ্ণতা (t2) = 80˚C
∴ গৃহীত তাপ (Q) = = m × s × (t2 – t1)
= 0.6 × 830 × (80 – 20)
= 0.6 × 830 × 60
= 29880 J
∴ বালি দ্বারা গৃহীত তাপের পরিমাণ 29880J (উত্তর)

পর্ব সমাপ্ত।পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন

এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতিঃ

বিজ্ঞান স্নাতক এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষিতা নন্দিতা বসুর পেশা শিক্ষকতা।তিনি বই পড়তে বড় ভালোবাসেন। কাজের ফাঁকে, অবসরে, বাসে ট্রামে তো বটেই, শোনা যায় তিনি নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও বই পড়তে পারেন।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।