mohuyar-deshe-bishode-alocona
Class-12

মহুয়ার দেশ | বিশদে আলোচনা

বাংলাদ্বাদশ শ্রেণি – মহুয়ার দেশ (বিশদে আলোচনা)

বিখ্যাত কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু ‘নবযৌবনের কবিতা’ প্রবন্ধে সমর সেন সম্পর্কে বলেছিলেন ‘সমর সেন শহরের কবি, কলকাতার কবি, আমাদের আজকালকার জীবনের সমস্ত বিকার, বিক্ষোভ ও ক্লান্তির কবি’। প্রকৃতই সমর সেনকে নাগরিক যুগযন্ত্রণার কবি বলা চলে। তাঁর বেশিরভাগ কবিতাতেই নগরজীবনের ক্লান্তি, বিষণ্নতা আর কৃত্রিমতা ছায়া ফেলে। নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা আর গ্লানি কবিকে ধ্বংস করে, তাঁর মগ্নচৈতন্যকে বিষাদময় করে তোলে। তাই তিনি পালিয়ে যেতে চান এই শহর থেকে দূরে – মেঘমদির মহুয়ার দেশে। কবিজীবনের মাঝামাঝি একটি প্রবন্ধে সমর সেন লিখছেন ‘reality-র থেকে নিষ্কৃতির চেষ্টা বলা যায় দুর্বল ভঙ্গি। প্রকৃতির স্বপ্নলোক ক্লীবের অলীক স্বর্গ’।

তাই বাস্তবকেই স্বীকার করে নিতে চেয়েছেন সমর সেন। তাঁর প্রাথমিক পর্বের কবিতার মধ্যে প্রেম-হতাশা, ব্যর্থতা, পাওয়া-না পাওয়া ইত্যাদি বিষয় হয়ে উঠে এসেছে। তবে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে দেখা যায় সমর সেনের কবিতার দিকনির্দেশ ধীরে ধীরে আমূল বদলে গিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ৪০-এর দশকের কলকাতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন সমর সেন। এলিয়টের কবিতার মতো এখানেও দেখা যাচ্ছিল Moore Land, মানুষ তখন একেকজন Hollow Man।

নাবাল জমির দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় নৈরাশ্য কবি সমর সেনের কবিতার বিষয় হয়ে দেখা দিল ক্রমে ক্রমে। এই অবক্ষয়িত শহরকে নিয়ে একসময় কবি লিখেছিলেন –

‘হে শহর, ধূসর শহর
লুব্ধলোকের ভিড়ে যখন নাচো
দশ টাকায় কেনা কয়েক প্রহরে, হে উর্ব্বশী
যখন শাড়ির আর তাড়ির উল্লাসে
অমৃতের পুত্রের বুকে চিত্ত আত্মহারা
নাচে রক্তধারা।’

সেই ক্লান্তি, সর্বব্যাপ্ত নৈরাশ্যবোধ ও নিষ্ক্রিয়তায় আবদ্ধ থাকার প্রবণতা সমর সেনের কবিতার অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। যুগযন্ত্রণায় অস্থির কবি তাই চলে যেতে চান মহুয়ার দেশে, সাঁওতাল পরগণার মায়াময় সৌন্দর্যের দুনিয়ায়। রাঙামাটির পথের ধারে, দীঘল দেবদারুর চিকন সবুজে কবি খুঁজে নেন দু-দণ্ডের শান্তি। নগরজীবনের ইঁটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় যে জীবন বয়ে চলে আবিল স্রোতের মত, তা কবি সমর সেনকে যেন বিষ পান করার যন্ত্রণা দিয়েছে বারবার।

ইংরেজ কবি কীটস্‌ বলেছিলেন, ‘My sense, as though of Hemlok I had drunk’।

কবি সমর সেনও যেন সেই নৈরাশ্যবোধে আক্রান্ত। কবি দেখেন নগর সভ্যতার আখমাড়াইতে জীবনের সব রঙ-রূপ-রস ময়লা গামছায় ছাঁকা হয়ে যায়। এ যেন – ‘Fade far away, dissolve and quite forget’। বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীর মানুষের কাছে বেঁচে থাকার অর্থ হয়ে উঠেছিল কেবলই টিকে থাকা, প্রাণটুকুকে অক্ষুণ্ন রেখে পরের দিনের জন্যে বয়ে চলা। রূঢ় বাস্তবের জুতোর তলায় চাপা পড়ে গিয়েছিল স্বপ্ন-কল্পনার সকল বিলাসিতা। এই পটভূমিতেই আমাদের আলোচ্য ‘মহুয়ার দেশ’ কবিতাটি রচিত।
কবিতাটিতে স্পষ্টতই দুটি স্তবক দেখা যায় যে দুটি স্তবকের কথনবস্তু একেবারেই পৃথক এবং তাতে বৈপরীত্য রয়েছে।

কবিতার প্রথম স্তবকে দেখা যায়, কবি সমর সেন কঠিন-সংঘাতময় এই বাস্তব সংসার ছাড়িয়ে বহুদূরের কোনও এক সৌন্দর্যের মায়া জড়ানো মেঘ মদির স্বপ্নলোকের বর্ণনা দিচ্ছেন যেখানে জ্যোৎস্নাদেহিনীর রহস্যাবাস, বাস্তবের বেদনাহীন মানুষের মন সেই আশ্চর্য নন্দন থেকে শান্তির আশ্রয় পাবে। পৃথিবীর সমস্ত রোম্যান্টিক কবিরা এমন এক সৌন্দর্যের নন্দনভূমি কল্পনা করে আকুল হয়েছেন। সমর সেনের কবিমানসে মহুয়ার দেশ মনে হয় তেমনই একটি স্থান।

তাঁর কবিতায় শহরের কোলাহল, নগ্ন রূঢ় বাস্তবের ছবি দেখে তাঁকে অনেকে নাগরিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। কিন্তু সমর সেনের মধ্যে আদপেই এক রোম্যান্টিক স্বপ্নবিলাসী সত্তা রয়েছে। বাস্তবে কবি এমন শহরে বাস করেন যে শহর ধূসর ও মুমূর্ষু। কবির অন্তরে বিষবাষ্পের মত ভিড় করে দুঃস্বপ্ন, বন্ধ্যা নগরসভ্যতার নাগরিক জীবনের ছায়াছবি। প্রথম পর্বের প্রথম স্তবকে কবি প্রকৃতির এক উজ্জ্বল চিত্র এঁকেছেন। সেখানে আমরা দেখি –

‘মাঝে মাঝে সন্ধ্যার জলস্রোতে
অলস সূর্য দেয় এঁকে
গলিত সোনার মত উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ
তার আগুন লাগে জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনায়।’

সন্ধ্যার আকাশে অস্তগামী সূর্যের গাঢ় লাল রঙের সঙ্গে গলিত সোনার উপমা জুড়ে দিয়ে কবি আমাদের প্রকৃতির সেই অসামান্য সৌন্দর্যের অনুভব দিতে চান। জলের উপর সেই অস্তগামী সূর্যের আলোর রঙ খেলা করে চলে। এরই মধ্যে রয়েছে কবির মনের দ্বন্দ্ব – একদিকে সূর্যের উজ্জ্বল সোনাঝরা রঙ আর অন্যদিকে জলের অন্ধকার, ধূসর ফেনা। কবির মনে হয় নাগরিক জীবন ও পরিবেশের বিষময় স্পর্শে প্রকৃতি ও জীবন তার কাছে হারিয়ে ফেলেছে সমস্ত জৌলুস। কিন্তু প্রথম স্তবকে কবির এই সৌন্দর্যচেতনা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কবি এই দমবন্ধ করা নাগরিক পরিবেশে থাকতে চাননি, তিনি চেয়েছেন মুক্তি, চেয়েছেন প্রকৃতির অমল-সৌন্দর্যে ডুব দিতে। এই মনোভাবই কবি-মনকে টেনে নিয়ে যায় চরম রোম্যান্টিকতার দিকে। ধূসর শহরের ঐ অন্ধকার অসহ্য মনে হয় তাঁর। তাই মনের ভিতর কল্পনার ছবি জেগে ওঠে এক স্বপ্নের দেশের।

মহুয়ার দেশই সেই স্বপ্নময় কল্পপুরী। কবি লেখেন –
‘অনেক অনেক দূরে আছে মেঘ মদির মহুয়ার দেশ,
সমস্ত ক্ষণ সেখানে পথের দুধারে ছায়া ফেলে
দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য’

কবির কানে ভেসে আসে দূর সমুদ্রের নাবিকের গান। নিত্য-নৈমিত্তিক দিনযাপনের গ্লানি থেকে মুক্তি চান সমর সেন। কীটসের মত তিনিও চান একটা পালিয়ে যাওয়ার উপাদান, নেশাতুর হয়ে মগ্নচৈতন্যে বিরাজ করতে। সেই নেশার প্রতীক এখানে মহুয়া ফুল। একইভাবে প্রকৃতির যে রূপ কবিকে নেশা ধরায়, এই মহুয়া ফুল তারও প্রতীক। নগরজীবনের ক্লান্তি আর হতাশা থেকে কবিকে নিষ্কৃতি দেয় এই মহুয়া ফুল।

নগরজীবনের করাল গ্রাসে প্রকৃতির হারিয়ে যাওয়ার কথা ধরা পড়েছে সমর সেনের অন্য একটি কবিতাতেও। সেখানে তিনি লিখছেন –

‘তিলে তিলে মৃত্যু রুদ্ধশ্বাস মৃত্যু আমাদের প্রাণ
দিকে দিকে আজ হানা দেয় বর্বর নগর’

বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে গ্রাম-পল্লী প্রকৃতির ধ্বংস এবং ক্রমান্বয় নগরায়ণের ছবিই ফুটে উঠেছে কবি সমর সেনের এই কবিতায়। ‘মহুয়ার দেশ’ কবির আর দেখা হয় না, কিন্তু মহুয়ার দেশ দেখার আকুতিতে কবি যেন বলে ওঠেন ‘হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনখানে’। সাঁওতাল পরগণার লাল মাটির দেশে কবির স্বপ্ন মদির হয়ে ওঠে। ক্লান্ত প্রাণ কবি আঁকড়ে ধরতে চান এক রোম্যান্টিক আবেগকে, প্রাণ এখানে বন্ধ্যা নয়।


দ্বাদশ শ্রেনি থেকে → বাংলা | ইংরাজি

এখানেই সব সঙ্গীত ক্রমে এসে ইঙ্গিতে থেমে যায়। শহরের রাত্রি, লম্পটের পদধ্বনি, রিক্সার উপর ক্লান্ত হতোদ্যম মানুষেরা কবির রুমাল থেকে কেড়ে নেয় ইভনিং-ইন-প্যারিসের গন্ধ। কবি তাই চান তাঁর ধ্বস্ত চৈতন্যের উপর ঝরুক মহুয়া ফুল, নামুক মহুয়ার গন্ধ। সেখানে কোন সুদূর থেকে লবণাক্ত সমুদ্রের বাতাস রাতের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে। ক্লান্ত কবির চেতনায় মহুয়া ফুল স্বপ্নের মত সুগন্ধ নিয়ে নেমে আসে এখানে। কিন্তু তবু কবির এই পলায়নী আবেশ চিরস্থায়ী হয় না।

কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে এসে দেখা যায় কবি শুনতে পান মহুয়া বনের ধারে কয়লা খনির বিশাল শব্দ। নাগরিক ক্লিন্নতা এখানেও কবির প্রশান্তিকে বিঘ্নিত করে। সেই খনির শব্দ আর খনির শ্রমিকদের অবসন্ন চেহারা, তাদের শরীরে লেগে থাকা ধুলোর কলঙ্ক কবিকে আবারও ক্লান্ত করে। যে মহুয়ার দেশে মহুয়া ফুলের মাদকতায় নেশাতুর হয়ে পড়েছিলেন কবি, এই কয়লা খনির শব্দ কবিকে আবার আছড়ে ফেলে বাস্তবের রূঢ় জমিতে। কল্পিত ইউটোপিয়া ভেঙে খান খান হয়ে যায়। স্পষ্টতই দেখা যায় এই কবিতার প্রথম স্তবকে মহুয়ার দেশকে নিয়ে কবির আশা ও স্বপ্ন বিলাস এবং পরের স্তবকে রয়েছে কবির স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি। সমর সেন লেখেন –

‘এখানে অসহ্য, নিবিড় অন্ধকারে
মাঝে মাঝে শুনি
মহুয়া বনের ধারে কয়লাখনির
গভীর, বিশাল শব্দ’

আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার করাল গ্রাস থেকে এই মহুয়ার দেশও নিষ্কৃতি পায় না। নগরজীবনে যে যন্ত্রসভ্যতা কবিকে ক্লান্ত করেছিল, মহুয়ার দেশে এসেও কবির দীর্ঘলালিত স্বপ্নকে ভেঙে খান খান করে দেয় এই কয়লাখনির যান্ত্রিক আর্তনাদ। প্রকৃতিকে হাতের মুঠোয় আনতে, মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনতে যন্ত্রকেই আরাধ্য করে তোলা হয় বর্তমান সভ্যতায়। নদীতে বাঁধ দেওয়া হয় জলস্রোতকে বেঁধে রাখতে, খনির ভিতর থেকে রত্ন, সম্পদ তুলে আনার জন্যও যন্ত্র রয়েছে।

একসময় এই যন্ত্রই নিয়ন্ত্রণ করবে মানব সভ্যতাকে, তারই আগাম বিনাশবার্তা যেন কবি শুনতে পেয়েছিলেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে সত্যচরণ চরিত্রটিও প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশে শ্রমজীবি মানুষের দৈন্য ও নিঃসঙ্গতাকে লক্ষ করেছিল। মহুয়ার দেশ ছিল কবির স্বপ্নের অলকাপুরী, কিন্তু তাও গিলে খেয়েছে যন্ত্রযুগের লোলুপ রসনা। কবি যেন শহরে নির্বাসিত এক যক্ষ, প্রকৃতির নিবিড় সবুজ সংসর্গে মহুয়ার মদির গন্ধে কবি তাই প্রিয়তমার উষ্ণ স্পর্শ খুঁজে নিতে চান।

মহুয়ার দেশ তাঁর পরম কামনার ধন হয়েও যেন সংরাগ রক্তিম মরীচিকার মত কোথায় কোন শূন্যে মিলিয়ে যায়। যন্ত্রসভ্যতার তাড়নায় রোম্যান্টিক স্বপ্ন সবই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব → আমি দেখি কবিতার সারসংক্ষেপ

এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখক পরিচিতি

প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সিমন রায়। সাহিত্যচর্চা ও লেখা-লিখির পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও সমান উৎসাহী সিমন।


JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

XII_Beng_Mohuyar_Desh_2