bharatiyo-somaj-songskar-andolon-shikkha-bybostha
WB-Class-8

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া সহযোগিতা ও বিদ্রোহ | প্রথম পর্ব | অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায়

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: ইতিহাস । অধ্যায় – ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া : সহযোগিতা ও বিদ্রোহ (পঞ্চম অধ্যায়)


ব্রিটিশ কোম্পানি এই বিরাট দেশে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গিয়ে উপলদ্ধি করেছিল, এই বিশাল দেশের কার্য পরিচালনা করার জন্য ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষিত দক্ষ কর্মী সবসময় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই তারা এই দেশের উচ্চবর্ণের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়। অর্থাৎ, যারা জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও শিক্ষা দীক্ষায় হয়ে উঠবে আধুনিক ব্রিটিশের অনুগামী জাতি। এদের সাহায্যেই ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি আরো দৃঢ় হয়ে উঠবে।
এই পরিকল্পনার দুটি ফলাফল হয়,

প্রথমত, একদল ব্রিটিশদের ‘মনের মত’ ভারতীয় সত্যিই তৈরি হয়, যারা জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও, শিক্ষা-দীক্ষায় হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশমনস্ক।
দ্বিতীয়ত, আরো একটি দল গঠিত হয়, যারা পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়ে ভারতবর্ষের সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে, স্বাধীন ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগ – বাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান | ভূগোল

বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলন

ব্রিটিশ কোম্পানি যখন ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হয়, তখন ভারতবর্ষ বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কারে আবদ্ধ একটি দেশ। গঙ্গা সাগরে সন্তান বিসর্জন থেকে শুরু করে সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি বিভিন্ন কু প্রথায় ভারতীয় সমাজ জর্জরিত।

এই সময় কিছু সংস্কার মুক্ত ভারতীয় মহাপুরুষের উদ্যোগে ও ব্রিটিশ শাসকদের সহায়তায় বহু সমাজ সংস্কারমূলক আইন পাশ হয়। যেমন –
1803 সালে লর্ড ওয়েলেসলী -এর মত ভয়ংকর নারকীয় প্রথাটি বন্ধ করে দেন।

রাজা রামমোহন রায়

রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে 1829 সালে লর্ড বেন্টিংক এর সহায়তায় সতীদাহ প্রথার মত সামাজিক ব্যাধি রোধ করার আইন প্রণীত হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 1856 সালে লর্ড ডালহৌসির শাসনকালে বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন করেন।

তবে একথা দুঃখের হলেও সত্য যে, এত সংগ্রামের মাধ্যমে এই সকল আইন প্রণয়ন হলেও, প্রায় সবক্ষেত্রেই দেখা গেছে কোনো প্রথাকেই আইনের মাধ্যমে চিরতরে বন্ধ করা যায়নি।

ব্রিটিশ সময়কালে শিক্ষা সংস্কার

বাংলায় শিক্ষা সংস্কার

ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে ছিল প্রাচীন সনাতন শিক্ষা। মূলত টোল, পাঠশালা ইত্যাদি স্থানে সংস্কৃত ভাষা সহ বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ, আয়ুর্বেদ, মহাকাব্য ইত্যাদি বিষয়ে পাঠদান করা হত।
তাও মূলত সমাজের উচ্চবর্ণ ও পুরুষরাই এই শিক্ষা গ্রহণের অধিকারী ছিল।
“সকলের জন্য শিক্ষা”এই ধরণের ধারণার অস্তিত্ব ছিলনা।
ধীরে ধীরে শাসনের সুবিধার্থে পাশ্চাত্য ধাঁচে পড়াশোনা শুরু করার জন্য বিভিন্ন স্কুল, কলেজ গড়ে উঠতে শুরু করে। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা হয়।

ডিরোজিও

এই নতুন শিক্ষাব্যবস্থার কথা আলোচনা করলে, সবার আগে যার নাম বলতে হয় তিনি হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডিরোজিও। তিনি ছিলেন কলকাতার হিন্দু কলেজের অধ্যাপক। তরুণ এই অধ্যাপক বহু ছাত্রকেই তাঁর শিক্ষার দ্বারা অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডিরোজিও

ডিরোজিও-এর অনুগামীদের বলা হত ‘নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী’।

তারা ভারতীয়দের গোঁড়ামি, কুসংস্কারের ঘোরতর বিরোধী ছিল। জাতপাতের বিভেদ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ইত্যাদি সামাজিক কুপ্রথার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। কিছুক্ষেত্রে তারা বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় এমন অসামাজিক ও অধার্মিক ঘটনা ঘটাতো, যার জন্য হিন্দু গোঁড়া সমাজ তাদের অত্যন্ত কুনজরে দেখত।

বিদ্যাসাগর শিক্ষা চিন্তা

ডিরোজিও-এর পরবর্তী সময়ে বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে এবং সমাজ সংস্কারে যে ব্যাক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেছিলেন তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই মহাপুরুষ অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন, কলকাতার স্ট্রিট লাইটের আলোয় পড়াশোনা করে হয়ে উঠেছিলেন অপার জ্ঞানের সাগর।

সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনার চাকরি করতে গিয়ে তিনি ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য-দের পাশাপাশি যাতে কায়স্থরাও পড়াশোনা করতে পারে সেই বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনি প্রথম উপলদ্ধি করেছিলেন মাতৃভাষায় শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজনীয়তা। তাই বাংলা ও ইংরাজি ভাষার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

তিনি ছাত্রদের জন্য অনেক বই রচনা করেছিলেন। যাদের মধ্যে বর্ণপরিচয় আজও শিশু পাঠ্য হিসাবে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর উদ্যোগেই পাশ্চাত্য ধাঁচে গণিত বিষয়টি পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয়। সহকারী স্কুল পরিদর্শক হিসাবে বিভিন্ন জেলায় মডেল স্কুল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

নারী শিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্রের ভূমিকা

নারী শিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্রের ভূমিকা অনস্বিকার্য। তিনি বুঝেছিলেন সমাজে নারী জাতি অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকলে কখনোই গোটা সমাজের উন্নতি সম্ভব না। তাই তাঁর উদ্যোগেই বাল্য বিবাহ রদ ও সেই শিশুকন্যাদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। তিনি নিজ খরচে বাংলার বিভিন্ন জেলায় বহু বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন। বহু মেয়েরাই তখন সেই সব স্কুলে পড়ত।

ভারতের অন্যত্র সমাজ ও শিক্ষা সংস্কার

উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই বাংলা সহ সারা দেশেই শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বিশেষত নারীশিক্ষা এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয়।

মহাদেব গোবিন্দ রানাডে

বিষ্ণুশাস্ত্রী পণ্ডিত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, আত্মারাম পাণ্ডুরং প্রমুখ ব্যাক্তি বর্গের উদ্যোগে বিভিন্ন সমাজ সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে। নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহ ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে। মাদ্রাজ বোম্বাইয়ের বহু শিক্ষিত মানুষই এই আন্দোলনগুলি সমর্থন করতেন।

পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


লেখিকা পরিচিতিঃ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত প্রত্যুষা মুখোপাধ্যায়। বিভিন্ন বিষয় চর্চার পাশাপাশি নাচ,গান, নাটকেও প্রত্যুষা সমান উৎসাহী।

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।



JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –

VIII_His_5a