WB-Class-8

ঘর্ষণ ও তার পরিমাপ

শ্রেণিঃ অষ্টম | বিষয়: বিজ্ঞান । অধ্যায় – বল ও চাপ (দ্বিতীয় পর্ব)


আমরা আগের পর্বের আলোচনা থেকে জেনেছি বলের পরিমাপ ও তার সাথে নিউটনের সূত্রের সম্পর্ক।

এই অধ্যায়ে আমরা ঘর্ষণ (friction) ও তার পরিমাপ সম্পর্কে আলোচনা করবো।

দুটি বস্তুকে যদি পরস্পরের সংস্পর্শে আনা হয়, তবে তাদের মধ্যে ঘর্ষণ কাজ করে। উদাহরণ হিসাবে আমরা ভাবতে পারি সাইকেল চালাবার কথা।

সাইকেল চালাতে গেলে আমরা দেখি যে অমসৃণ বা এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালানো কষ্টকর। কিন্তু যদি রাস্তা মসৃণ হয়, তাহলে সহজেই সাইকেল চালানো সম্ভব হয়। এর কারণ হল ঘর্ষণ।

যে দুটি বস্তুর মধ্যে ঘর্ষণ হচ্ছে, তাদের তল মসৃণ হলে ঘর্ষণ কম হয়, কিন্তু বস্তু দুটি অমসৃণ হলে ঘর্ষণের পরিমাণ বেশী হয়।

তাই দেখবে শিক্ষকরা গম্ভীর স্বভাবের হলে বেশিরভাগ সময়েই তোমাদের ক্লাস করতে মন চায় না বা তাঁর দেওয়া পড়াও ভয়ে গুলিয়ে যায়, কিন্তু শিক্ষক হাসিখুশি নরম স্বভাবের মানুষ হলে স্কুলে যাওয়া আর পড়া দুটোই অনেক আনন্দদায়ক হয়। এখানে শিক্ষকের গম্ভীর মুখই ধরে নাও ঘর্ষণ বলের প্রয়োজনীয় অমসৃণ তল। [তবে এই সকল উদাহরণ শুধুই তোমাদের বোঝার সুবিধার জন্য এর ব্যবহার পরীক্ষার খাতায় করলে শিক্ষকের গম্ভীর মুখের প্রকোপজনিত ঘর্ষণ বলের প্রভাব সব থেকে বেশি তোমার উপরেই পড়বে।]

subscribe-jump-magazine-india

তাহলে ঘর্ষণ কি?

ঘর্ষণ হল কোন একটি তল যখন অন্য একটি তলের উপর দিয়ে পিছলে বা গড়িয়ে যায়, বা যাবার চেষ্টা করে, তখন এক তল অন্য তলের গতিরুদ্ধ করতে যে বল প্রয়োগ করে তাকে ঘর্ষণ বলে।

ঘর্ষণ সবসময় বস্তুর গতির বিপরীতে কাজ করে, ফলে গতি বাধা পায়। এই কারণের জন্যই কোন বলকে মাটির উপর গড়িয়ে দিলে যতদূর যাবে, মসৃণ সিমেন্টের মেঝের উপর দিয়ে গড়িয়ে দিলে তার থেকে বেশী দূর পর্যন্ত যাবে। অনেকটা ঐ গম্ভীর শিক্ষকের সামনে পড়া গুলিয়ে যাওয়ার মতন ঘটনা। কারণ মসৃণ মেঝের ক্ষেত্রে ঘর্ষণ অপেক্ষাকৃত কম। ফলে বলের গতি কম বাঁধাপ্রাপ্ত হবে এবং বেশীদূর যেতে পারবে। অন্যদিকে মাটি অপেক্ষাকৃত অমসৃণ তলে ঘর্ষণ বেশী হয় এবং যেহেতু ঘর্ষণ গতির বিপরীতে কাজ করে, তাই বলটি অপেক্ষাকৃত কম দূরত্ব অতিক্রম করে।


অষ্টম শ্রেণির অন্য বিভাগ – বাংলা | ইংরেজি | গণিত | বিজ্ঞান

ব্যাপারটা একটি উদাহরণের সাহায্যে বুঝে নেওয়া যাক।

ধরো একটি টেবিলের উপর একটি কাঠের ব্লক রাখা আছে। বল প্রয়োগ করে ব্লকটিকে ঠেলার চেষ্টা করা হল। প্রথমে অল্প বল প্রয়োগ করা হল, দেখা গেল ব্লকটি স্থির অবস্থায় আছে। এই অবস্থায় ব্লক ও টেবিলের মধ্যে সমান ও বিপরীত মুখী ঘর্ষণ বল সৃষ্টি হয়, যা ব্লকটিকে গতিশীল হতে বাঁধা দেয়। [নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুসারে]
প্রযুক্ত বলের পরিমাণ যত বাড়ানো হবে, ঘর্ষণের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পাবে, এবং এই ঘর্ষণ বল সর্বদা গতির বিরুদ্ধে ক্রিয়া করবে।

ব্লকটি যতক্ষণ পর্যন্ত স্থির থাকবে, অর্থাৎ যতক্ষণ ব্লক ও টেবিলের মধ্যে কোন আপেক্ষিক গতি থাকবে না, ততক্ষণ ব্লক ও টেবিলের মধ্যে যে ঘর্ষণ বল ক্রিয়া করে তাকে স্থিত ঘর্ষণ বা স্থির অবস্থার ঘর্ষণ (Static friction) বলে।

ঘর্ষণ সর্বোচ্চ যে সীমায় পৌঁছানো পর্যন্ত ব্লকটি স্থির থাকে তাকে ঘর্ষণের সিমা মান (Limiting friction) বলে। এই বলের মান দুটি নির্দিষ্ট উপাদানের ক্ষেত্রে সবসময় একই থাকে। এর অধিক বল প্রয়োগ করলে ব্লকটি গতিশীল হয়।

এই অবস্থায় ব্লক ও টেবিলের মধ্যে যে ঘর্ষণ হয় তাকে গতিশীল অবস্থার ঘর্ষণ বা বিসর্প বা চল ঘর্ষণ (Sliding friction বা Kinetic friction) বলে।

এখন প্রশ্ন হল এই ঘর্ষণ বল কিভাবে পরিমাপ করবো?

আগের পর্বে তোমরা জেনেছিলে বল পরিমাপের একক নিউটন ও ডাইন। এই ক্ষেত্রেও কাঠের ব্লকটির সাথে স্প্রিং তুলা জুড়ে টানা হলেই তুমি স্প্রিং তুলার কাঁটার পরিবর্তন দেখতে পাবে।

ধরো দেখা গেল স্প্রিং তুলার কাঁটা 1 কেজি বা 9.8 নিউটন দাগে রয়েছে এর অর্থ তুমি ঐ ব্লকটিকে 9.8 নিউটন বল প্রয়োগে টানছ, এখন ব্লক যদি একই স্থানে স্থির থাকে তবে বুঝতে হবে, নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুসারে ঘর্ষণ বলও বিপরীত দিকে ঐ একই বল প্রয়োগ করছে, তাই ব্লকের স্থান পরিবর্তন হয়নি। এখন যদি তুমি তোমার টান আরো বাড়াও তাহলে একটা সময় ব্লকটি সরবে অর্থাৎ বুঝতে হবে তোমার প্রদত্ত বল ঘর্ষণ বল অপেক্ষা বেশি হচ্ছে তাই ব্লকটি তোমার দিকে সরে আসছে।

এখন দেখে নেওয়া যাক দুই সংস্পর্শ যুক্ত তলের মধ্যে ঘর্ষণের কি প্রভাব

যদি দুই সংস্পর্শ যুক্ত তলের মধ্যে আপেক্ষিক গতি থাকে তবে তাদের মধ্যে যে ঘর্ষণ বল ক্রিয়া করে তাকে চল ঘর্ষণ বলে।

চলমান অবস্থায় কোন বস্তুর ঘর্ষণ বল বস্তুটি গতিশীল হতে উপক্রম করার মুহূর্ত পর্যন্ত ঘর্ষণ বল অপেক্ষা কম হয়।

কিন্তু সংস্পর্শ যুক্ত তল দুটির ক্ষেত্রফলের উপর চল ঘর্ষণ নির্ভর করে না করলেও তল দুটির প্রকৃতি, অবস্থা এবং উপাদানের উপর চল ঘর্ষণের মান নির্ভর করে।

আবার ঘর্ষণ বল সব সময় সংস্পর্শে থাকা তল দুটির সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে কাজ করে। ঘর্ষণের পরিমাণ বস্তুর ওজনের উপর নির্ভর করে।

বস্তু যত ভারী হয়, ঘর্ষণ বলের মান তত বেশী হয়। তাই দেখবে ক্লাস 5 এর তুলনায় ক্লাস 8 এর স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ফুচকার দোকানে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে অনেকক্ষণ ফুচকা খাওয়া বেশি কষ্টকর।কারণ ক্লাসের উন্নতির সাথে সাথে বইয়ের সংখ্যাও বাড়ে আর বাড়ে পিঠের ব্যাগের ওজন।

চল ঘর্ষণের মত স্থিত ঘর্ষণের মানও স্পর্শতলের ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভর করে না। তলের প্রকৃতি ও উপাদানের উপর নির্ভর করে।

ঘর্ষণ যেমন আমাদের অসুবিধা সৃষ্টি করে, তেমনি অনেক সুবিধাও সৃষ্টি করে। শিক্ষকের উদাহরণে যদি ফিরে যাই তাহলে বুঝতে পারবে বকুনির কিন্তু প্রয়োজন আছে, শিক্ষক সবসময় শান্ত হাসিখুশি থাকলে কিন্তু তোমাদের মধ্যে একটু দুষ্টুরা পড়াশোনায় ফাঁকি দিতে শুরু করে দাও, আবার বকুনি খেলেই পড়তে বসে যাও।

অর্থাৎ ঘর্ষণ না থাকলে আমরা কিন্তু কোন কাজই করতে পারতাম না। হাঁটতে পারতাম না, কোন কিছু হাতে করে ধরে রাখতে পারতাম না। ঘর্ষণ না থাকলে নাট–বোল্ট, পেরেক প্রভৃতি আটকানো যেত না, যানবাহন রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারত না। তাই ঘর্ষণ বল ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন অচল।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত। পরবর্তী পর্ব 👉 তরলের ঘনত্ব

এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।



এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সরাসরি অংশগ্রহন করতে যুক্ত হতে পারেন ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।