newton's-law-physical-science
WB-Class-9

বল ও গতি (নিউটনের গতিসূত্র ও বলের সংজ্ঞা)

বিষয়: ভৌত বিজ্ঞান । শ্রেণী: নবম । অধ্যায়: বল ও গতি (নিউটনের গতিসূত্র ও বলের সংজ্ঞা)



গত পর্বে আমরা দেখেছিলাম যে কিভাবে সরণ, বেগ ও ত্বরণ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু একটা ব্যাপার এখনো আমাদের কাছে পরিষ্কার নয় যে বল কাকে বলে? কি কারণে কোনো বস্তুর মধ্যে ত্বরণ বা মন্দনের সৃষ্টি হয়? কোনো বস্তু কি নিজের ইচ্ছেতেই বেগ পরিবর্তন করে নাকি, বাইরে থেকে কারুর সাহায্য দরকার হয়? এই সব বুঝতে আমাদের এক বিশেষ ব্যক্তির কাছে যেতে হবে।

না না! সশরীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ তিনি আজ জীবিত নেই।

-তাহলে যাবো কেমন করে?

-কেন? বইয়ের হাত ধরে!!!

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছ যে কার কথা আমরা আলোচনা করছি। হ্যাঁ, সেই সর্বজ্ঞ নিউটন, যিনি পদার্থবিদ্যার সকল বিভাগে ‘নাক’ গলিয়েছিলেন (একমাত্র শব্দের বেগ গণনা করা ছাড়া বাকি সবেতেই তিনি সফল হয়েছিলেন)। সেই নিউটনের হাত ধরে আজ বুঝে নেবো, কোন বস্তুর ইচ্ছা কিরকমের হয়।

[আরো পড়ুন –বল ও গতি অধ্যায়ের প্রথম পর্ব – বেগ, সরণ ও ত্বরণের ধারণা]

যারা স্থির থাকে তারা কেন স্থির থাকে? যারা গতিশীল হয় কেন গতিশীল হয়েই থেকে যায়? এদের ইচ্ছের পরিবর্তন করতে গেলে কি করতে হবে? যদি পরিবর্তন করেও দিই তাহলে কি তার কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরী হবে?

নিউটন এই সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন তিনটি মাত্র সূত্রের সাহায্যে। এদেরকে একত্রে নিউটনের গতিসূত্র বলে। এই সূত্র তিনটি থেকে তিনটি নতুন ধারণার সৃষ্টি হয় –

১. জাড্য

২. বল

৩. ভরবেগের নিত্যতা সূত্র

JUMP whats-app subscrition

এগুলো কি এবং কোথা থেকে এগুলির জন্ম সেটি জানতে গেলে আমাদের তিনটি গতিসূত্র আগে বুঝতে হবে।

নিউটনের প্রথম গতিসূত্র: বাইরে থেকে প্রযুক্ত বল দ্বারা বাধ্য না করলে কোনো স্থির বস্তু চিরকাল স্থির ও গতিশীল বস্তু চিরকাল সমবেগে সরলরেখায় গতিশীল থাকবে।

এখানে কোনো বস্তু তার কি ইচ্ছা প্রকাশ করছে সেটির সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যে বস্তুটি স্থির আছে তার ইচ্ছে চিরকাল স্থির থাকা। যে বস্তু গতিশীল সে গতি হারাতেও চায় না, বাড়াতেও চায় না, দিক পরিবর্তন তো আরোই করতে চায় না। তার ইচ্ছে সমান বেগে সোজা রাস্তায় গড়গড় করে চলতে থাকা। এই ইচ্ছেটার নামই হচ্ছে জাড্য।

সহজ ভাবে বোঝার জন্য, আমরা বলতে পারিঃ

স্থির বস্তুর স্থির থাকার ইচ্ছে = স্থিতিজাড্য

গতিশীল বস্তুর সমবেগে সরলরেখায় চলার ইচ্ছে = গতিজাড্য

ধরা যাক একজন খুব কুঁড়ে ছেলে আছে, সে সারাদিন ঘুমিয়েই থাকতে ভালোবাসে। তাকে যতক্ষণ না বকে ঘুম থেকে জোর করে তুলে না দেওয়া হয়, সে ঘুমোতেই থাকবে। এটাই যেন স্থিতিজাড্য।

আবার কোনো একটা মেয়ে খুব চঞ্চল। সারাদিন সে দৌড়ঝাঁপ করে চলেছে। কেউ বারণ করছে না, থামাচ্ছে না, বাধা দিচ্ছে না। সে কি কখনো থামবে? অফুরন্ত শক্তি তার, সে নানারকম কাজ করে কিন্তু মোটেও হাঁপিয়ে যায় না। এটাই যেন গতিজাড্য।

[আরও পড়ুন – ভৌত বিজ্ঞান । প্রথম অধ্যায়: পরিমাণ ও একক]

তাহলে নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে আমরা কি পেলাম?

জাড্য সম্পর্কে ধারণা।

আরো একটা জিনিস এখানে আমরা উল্লেখ করেছি; “বাইরে থেকে প্রযুক্ত বল”। সেটি কি? সেটি একরকমের বাধা। ইচ্ছের বিরুদ্ধে দেওয়া বাধা। কুঁড়ে ছেলেটির গায়ে ঠান্ডা জল ঢেলে দাও, লাফিয়ে উঠবে। মানে তুমি তার ইচ্ছের পরিবর্তন করতে, বল প্রয়োগ করলে। চঞ্চল মেয়েটিকে ধরে রাখো, আর দৌড়াদৌড়ি করতে পারবে না। এখানেও তুমি বল প্রয়োগ করেই তাকে থামালে। কোনো গতিশীল বস্তুর দিক পরিবর্তন করতে গেলেও একমাত্র বাধা দিয়েই তা করা যায়।

[আরও পড়ুন – ভৌত বিজ্ঞান । দ্বিতীয় অধ্যায়: পরমাণুর গঠন]

যেমন বোলারের হাত থেকে বেরিয়ে আসা বলকে ব্যাটের বাধা। তখন সেটি অভিমুখ পরিবর্তন করে মাঠের বাইরে উড়ে যায়।

সৌরভ গাঙ্গুলির বিখ্যাত ‘বাপী বাড়ি যা’

এই বাধাটির নামই হলো বল বা force। ইংলিশের বল (Ball) নয় কিন্তু, এটি বাংলার বল।

কিন্তু এই বল কতটা প্রয়োগ হচ্ছে তা মাপবো কেমন করে?

নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র: কোনো বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বলের মান বস্তুটির ভরবেগের পরিবর্তনের হারের সাথে সমানুপাতিক। প্রযুক্ত বল যে অভিমুখে ক্রিয়া করে, ভরবেগের পরিবর্তনও সেই অভিমুখেই হয়।

এখানে ভরবেগ নামের একটি নতুন শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে। দেখে নিই ভরবেগ ব্যাপারটা কি।

ছোটবেলায় কেউ পিট্টু খেলেছো? খুব সহজ একটি খেলা, সাতটি চাকতি আকারের আসবেস্টসের বা পাথরের টুকরোকে একটার ওপর একটা রেখে সাজাতে হয়। তারপর একটা বল ছুড়ে সেই stack-টিকে ফেলে দিয়ে হয়। এবার প্রতিপক্ষ ওই বল ছুড়ে এই দলের খেলোয়াড়দের মারে, আর এই দলের খেলোয়াড়রা সেই stack-টিকে আবার সাজাতে চেষ্টা করে। প্রতিপক্ষের ছোঁড়া বল গায়ে লাগলে আউট। তাহলে আউট হওয়ার আগেই ওই সাতটা টুকরোকে আবার stack এ সাজাতে হবে।

[আরো পড়ুন –‘কলিঙ্গ দেশে ঝড়বৃষ্টি’ কবিতাটির সারাংশ]

এই মারটি ছিল মোক্ষম। কেউ যদি খুব জোরে বলটি ছুঁড়তো, গায়ে খুব লাগতো। কিন্তু কেউ আস্তে ছুঁড়লে কম লাগতো। এমনকি তার থেকে অনেক ভারী ফুটবল গায়ে লাগলেও এতটা ব্যাথা করতো না। এর কারণ ভরবেগ। ভরবেগ মানে ভর ও বেগের গুণফল। ভর কম, বেগ বেশি; ভরবেগ বেশি। যেমন বুলেট। ভর বেশি, বেগ কম; ভরবেগ বেশি। যেমন হাতিকে ব্যবহার করে গম পেষানো।

এই ভরবেগ পরিবর্তিত হয় যখন কোনো বস্তুতে বল প্রয়োগ হয়। আমরা আগেই জেনেছি ইচ্ছের (জাড্যের) কথা। এখন স্থির বস্তুর বেগ শূন্য। সুতরাং ভরবেগ শূন্য। গতিশীল বস্তুর বেগ ধ্রুবক। সুতরাং যদি কোন বস্তুর গতিশীল অবস্থায় ভরের পরিবর্তন না হলে ভরবেগও ধ্রুবক থাকে।

এখন স্থির বস্তুতে বল প্রয়োগ করলে সে বেগ পাবে, তার ভরবেগের মানও শূন্যের থেকে বাড়বে। কারণ এখন আর বেগ শূন্য নয়। আর গতির অভিমুখও সেটাই হবে যে অভিমুখে বল প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন কাউকে দক্ষিণ দিকে ঠেললে সে দক্ষিণ অভিমুখেই যাবে।

[আরো পড়ুন – Tales of Bhola Grandpa]

আবার গতিশীল বস্তুকে ধাক্কা দিলে হয় সে থেমে যাবে, না হয় সে ধীরে চলতে শুরু করবে, নাহলে সে আরো দ্রুত চলতে শুরু করবে, নচেৎ তার দিক পরিবর্তন হবে। এই চারটি ক্ষেত্রেই আমরা দেখলাম তার বেগের পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থাৎ তার ভরবেগ পরিবর্তিত হচ্ছে।

সময়ের সাপেক্ষে এই ভরবেগের পরিবর্তনের হার, প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক।

অর্থাৎ F(বল) ∝ (mV2-mV1)/t যেখানে m = ভর, V2= অন্তিম বেগ, V1= প্রাথমিক বেগ, t= সময়

অর্থাৎ কিনা F = km(V2-V1)/t

এখন আমরা জানি (V2-V1)/t = a বা acceleration (ত্বরণ বা মন্দন)

অর্থাৎ F = kma 

এখন এখানে বল মানে F কে সংজ্ঞায়িত করা হয় এরকম ভাবে,

একক ভরের (m = 1) কোনো বস্তুর ওপর একক ত্বরণ (a = 1) সৃষ্টি করতে যে বল প্রয়োগ করতে হয় তাকে একক বল বলে.

অর্থাৎ m = 1 এবং a=1 হলে F=1 হবে।

তাহলে F = kma তে m = 1, a=1 এবং F=1 বসিয়ে পাই 1= k × 1 × 1

অর্থাৎ, k =1

অর্থাৎ F = ma

কিন্তু এই সূত্র আমাদের এই ধারণা দেয় না যে বল প্রয়োগের ফলে কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো. তার জন্য তৃতীয় গতিসূত্র।

নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র: প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।

মানে তুমি যদি কোনো স্থির বস্তুকে গতিশীল অবস্থায় ধাক্কা মারো, তাহলে সে গতিশীল হয়ে পড়বে। কিন্তু তার জাড্যের কারণে সেও তোমার ওপর একটা বাধার সৃষ্টি করবে। ফলে, তোমার গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তুমি ধীর বা স্থির হয়ে যাবো।

[আরো পড়ুন – ইলিয়াস গল্পের সারাংশ]

ক্যারামের স্ট্রাইকার গুটিকে মারলে গুটি চলতে শুরু করে কিন্তু স্ট্রাইকারটি হয় থেমে যায়, নাহলে ধীরে হয়ে যায়, নইলে বেঁকে যায়। এর কারণ স্ট্রাইকারটি যে পরিমাণ বল দিয়ে গুটিটির জাড্য পরিবর্তন করেছে, গুটিটিও সমান পরিমাণ বল প্রয়োগ করে স্ট্রাইকারটির জাড্য পরিবর্তন করতে চেয়েছে। একটিতে বেগের সঞ্চার হলে অপরটি মন্দীভূত হয়েছে। অর্থাৎ একটির ত্বরণ অপরটির মন্দনের কারণ। এই কারণেই বিপরীত প্রতিক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে।

carrom-board

এই সূত্রের গণিতকে বুঝতে গেলে আমাদের ভরবেগের নিত্যতা সূত্রটি অনুধাবন করতে হবে।

ভরবেগের নিত্যতা সূত্রটি বলছে, যতই দুটি বস্তু নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে বেগের পরিবর্তন ঘটাক না কেন, বল প্রয়োগের আগে বস্তুদুটির মোট ভরবেগ, বল প্রয়োগের পর বস্তুদুটির মোট ভরবেগের সাথে সমান হবে।

অর্থাৎ

m1V1+m2V2=m1V3+m2V4

or, m1V1 – m1V3=m2V4 – m2V2

or, m1(V1 -V3) = m2(V4 – V2)

or, m1(V1 -V3)/t = m2(V4 – V2)/t

or, -m1(V3-V1)/t = m2(V4 – V2)/t

or, -m1a1 = m2a2

or, -F1=F2

এর মানে যেখানে, m1=প্রথম বস্তুর ভর, m2=দ্বিতীয় বস্তুর ভর,

V1+= প্রথম বস্তুর প্রাথমিক বেগ, V2=দ্বিতীয় বস্তুর প্রাথমিক বেগ,

V3= প্রথম বস্তুর অন্তিম বেগ, V4=দ্বিতীয় বস্তুর অন্তিম বেগ,

a1= প্রথম বস্তুর ত্বরণ, a2=দ্বিতীয় বস্তুর ত্বরণ

t = বল প্রয়োগের সময়কাল

F1= প্রথম বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল , F2=দ্বিতীয় বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল

অর্থাৎ কিনা বল দুটির মান সমান। ঋণাত্মক চিহ্ন বিপরীত অভিমুখকে নির্দিষ্ট করছে (অর্থাৎ একটিতে ত্বরণ হলে অপরটিতে মন্দন হবে)।


এই লেখাটি থেকে উপকৃত হলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলো না।

এছাড়া,পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ের যে কোনো প্রশ্ন সরাসরি আমাদের করতে পারো ‘লেখা-পড়া-শোনা’ ফেসবুক গ্রূপে। এই গ্ৰুপে গিয়ে প্রশ্ন পাঠালে, আমাদের বিশেষজ্ঞরা পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে তার উত্তর দেবেন। গ্রুপে যুক্ত হতে ক্লিক করুন এখানে।

lekha-pora-shona-facebook-group

Leave a Reply