rush-biplob
WB-Class-9

রুশ বিপ্লব এবং বিশ্ব ইতিহাসে তার প্রভাব

ইতিহাসনবম শ্রেণি – বিশ শতকে ইউরোপ (দ্বিতীয় পর্ব)


আগের পর্বে আমরা রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আমরা রুশ বিপ্লব এবং বিশ্ব ইতিহাসে তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবো।

আমরা আগেই জেনেছি যে, রাশিয়ার শাসকদের বলা হত জার এবং রুশ বিপ্লবের সময়ে রাশিয়ার জার ছিলেন দ্বিতীয় নিকোলাস। তাঁর শাসনকালের রাশিয়ার মধ্যে রাজবিদ্রোহ চরমে ওঠে।

জারের পদত্যাগ ও অস্থায়ী সরকার গঠন

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ই মার্চ বলসেভিকদের নেতৃত্বে রাশিয়ার প্রধান শহর পেট্রোগ্রাডে ধর্মঘট শুরু হয়। তাদের মূল দাবী ছিল স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উচ্ছেদ (ব্যাক্তিকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থাকে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলা হয়)। ১১ই মার্চ বিদ্রোহ চরমে ওঠে, সরকার বিদ্রোহীদের উপরে গুলি চালাবার আদেশ দিলে সেনাবাহিনী তা অস্বীকার করে এবং তারা বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেয়।

পেট্রোগ্রাডে মার্চ বিপ্লব

শক্তিশালী বিদ্রোহীরা অস্ত্রাগার লুঠ করে এবং অস্ত্রের সাহায্যে পেট্রোগ্রাড দখল করে। সরকারের মন্ত্রীরা বিপ্লবীদের হাতে বন্দী হয়। অবশেষে ১৩ই মার্চ জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং রাশিয়ায় রোমানভ বংশের শাসনকালের পতন ঘটে। এরপর মন্ত্রীদের নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। একে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ বিপ্লব বলা হয়।

সেই সময় রাশিয়ার জনগণের মূলদাবীগুলি ছিল –

  • সেনাদল মনে করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বন্ধ হবে
  • কৃষকেরা মনে করেছিল কুলকদের (ভূস্বামী) আধিপত্য বিলোপ হবে এবং ভূমিসংস্কার হবে
  • শ্রমিকরা মনে করেছিল তাদের মজুরী ঠিক হবে এবং কাজের সময় আট ঘণ্টা সীমাবদ্ধ হবে
  • অ-রুশ জাতির মানুষরা ভেবেছিল রাশিয়ায় তাদের অধিকার স্বীকৃত হবে
অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীসভার মিটিং

অস্থায়ী সরকার কোন প্রত্যাশাই পূরণ করতে পারেনি। ফলে জনমানসে পুনরায় ক্ষোভের সঞ্চার হতে শুরু করে। গ্রামে গ্রামে শ্রমিক, কৃষক এবং সৈনিকদের নিয়ে পরিষদ বা ‘সোভিয়েত’ গড়ে ওঠে।

ভ্লাদিমির লেনিন

রুশ বিপ্লবে বলসেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন ভ্লাদিমির লেনিন। বিখ্যাত এই কমিউনিস্ট নেতাকে আগের সরকার নির্বাসন দিয়েছিলেন, কিন্তু মার্চ বিপ্লবের পরে তিনি রাশিয়ায় ফিরে আসেন এবং তাঁর বিখ্যাত ‘এপ্রিল থিসিস’ প্রকাশ করেন।

‘এপ্রিল থিসিস’ -এর প্রধান দাবী সমূহ

এই কর্মধারা মাধ্যমে তিনি দাবী করেন – বুর্জোয়া (পুঁজিবাদী) প্রজাতন্ত্রী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সেই ক্ষমতা সোভিয়েতগুলির হাতে দিতে হবে। তাই বলসেভিক কর্মীদের তিনি অস্থায়ী সরকার উচ্ছেদের ডাক দেন। তিনি ক্ষমতালাভের পরে তিনি বলসেভিকদের কাজের দিকগুলিও ঠিক করেছিলেন।

ক) যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া

খ) উৎপাদন, বণ্টনব্যবস্থা, অর্থকাঠামো এবং বৈদেশিক নীতির উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ

গ) কৃষকদের জন্য ভূমিসংস্কার

ঘ) শিল্পের জাতীয়করণ এবং শ্রমিকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা

এই দাবীগুলির সাথে লেলিন ‘সর্বহারার একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দেশের সকল শ্রমিক, কৃষক, সৈনিক ও সাধারণ মানুষদের এক হবার ডাক দেন।

অস্থায়ী সরকারের পতন

১৯১৭ সালের ১৬ই জুলাই অসংখ্য সাধারণ মানুষ পেট্রোগ্রাডের রাস্তায় জমায়েত হয়ে ‘সোভিয়েত’ দের ক্ষমতাকরণের কথা বলেন। সরকার এই শান্তিপূর্ণ অবস্থানের উপর গুলি চলালে অবস্থা হাতের বাইরে চলে যায়।

শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর গুলি চালায় পুলিশ

এই অবস্থায় দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেনসেভিক দলের সেনাপতি ‘আলেকজান্ডার কেরেনেস্কি’। কিন্তু এই আলেকজান্ডারের নেতৃত্বাধীন সরকারও জনগণের ক্ষোভ সামলাতে ব্যার্থ হয়। দেশে সংকট তীব্র হয়।

বলসেভিক সরকারের ক্ষমতা দখল

অবশেষে ১৯১৭ সালের ৭ই নভেম্বর লেনিনের নির্দেশে তাঁর অনুগত ট্রটস্কি ‘রেড আর্মি’ নামে একটি সশস্ত্র সেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়ে পেট্রোগ্রাড দখল করেন এবং রাশিয়ায় বলসেভিকদের শাসনকাল শুরু হয়। এই ঘটনা নভেম্বর বিপ্লব নামে খ্যাত।

নভেম্বর বিপ্লবের পরের দিন

বিশ্ব ইতিহাসে রুশবিপ্লবের প্রভাব

রুশ বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই বিপ্লবের মাধ্যমে সর্বপ্রথম একটি সাম্যবাদী বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতাদখল করার পরে কিছুদিন রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে এই সংকট কাটিয়ে ‘সর্বহারার একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা হয়। রাশিয়ার নাম পরিবর্তিত হয়ে নতুন নামকরণ হল ‘ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিক’ বা USSR।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – বাংলা | নবম শ্রেণি – ইতিহাস | নবম শ্রেণি – ভূগোল]

রুশবিপ্লবের আন্তর্জাতিক প্রভাব

বলাই বাহুল্য এই বিপ্লব সারা পৃথিবীর সকল নিপীড়িত এবং শোষিত মানুষদের উদ্ভুদ্ধ করে এবং বিশ্বের বহু দেশে সাম্যাবাদী ভাবধারা ছড়িয়ে পড়ে। রাজতন্ত্র উপেক্ষা করে দুর্বল প্রজাতন্ত্রের ছায়া থেকে বেরিয়ে সাম্যাবাদি ভাবধারার একনায়ক শাসনব্যবস্থা বহু দেশের আন্দোলনকারীদের সামনে একটি নতুন রাস্তার উন্মোচন করে। ধনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাড় করায়।

পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেমন চেকোস্লোভাকিয়া, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া প্রভৃতি দেশে সাম্যবাদি সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। জার্মানি এবং অস্ট্রিয়ায় রাজতন্ত্রের পতন হয়। ভারতবর্ষ, চীন সহ বহুদেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে এবং আন্দোলন শুরু হয়।

বিশ্বের ধনতান্ত্রিক দেশ যেমন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশগুলি শ্রমিককল্যাণ মূলক আইন প্রবর্তন করতে বাধ্য হয়। তবে সাম্যবাদের গতি রোধ করার উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদ শক্তিশালি হয়ে ওঠে।

লেনিনয়নীতি ও নতুন অর্থনৈতিক নীতি

রাশিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন শুরু হলে তারা নতুন করে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে শুরু করে। যুগের প্রয়োজন উপলব্ধি করে লেনিন বিশুদ্ধ মার্ক্সবাদ থেকে সরে আসেন এবং একটি যুগোপযোগী নীতির প্রবর্তন করেন; এই অর্থনৈতিক নীতিকে নতুন অর্থনৈতিক নীতি বা NEP বলা হয়। এর মূল নীতিগুলি ছিল  –

ক) কৃষকদের উদ্বৃত্ত ফলস সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্র করায়ত্ত্ব করবে না, তারা একটি নির্দিষ্ট কর দিয়ে বাকি ফসল বাজারে বিক্রি করতে পারবে।


[আরো পড়ুন – নবম শ্রেণি – ভৌত বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – জীবন বিজ্ঞান | নবম শ্রেণি – গণিত]

খ) ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে সরকারী নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে তা ব্যাক্তিগত মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
গ) বৈদেশিক বাণিজ্য ছাড়া অন্য সব ধরণের বাণিজ্য ব্যক্তিগত হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এই বাস্তবসম্মত নীতিগুলি সোভিয়েত ইউনিয়নে সাম্যবাদী সরকারের ভীত মজবুত করে।

পর্ব সমাপ্ত।


এই লেখাটির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই লেখা, অডিও, ভিডিও বা অন্য ভাবে কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এই পর্বটি ভালো লাগলে সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।


JumpMagazine.in এর নিয়মিত আপডেট পাবার জন্য –